স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়া ফ্রয়েড

কোপার্নিকাস আমাদের জানিয়েছিলেন যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; ডারউইন প্রমাণ করেছিলেন যে মানুষ ঈশ্বরের বিশেষ সৃষ্টি নয়, বরং পশুজগত থেকে উদ্ভূত; আর ফ্রয়েড আমাদের অহংকারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়ে বলেছিলেন—”মানুষ তার নিজের মনের ঘরেরও কর্তা নয়” ।

মানুষের মনের অলিগলি খোজা লোকটি শারীরিক যন্ত্রণার সাথে পেরে না উঠে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন।

ফ্রয়েড ছিলেন একজন প্রবল ধূমপায়ী।দিনে ২০টিরও বেশি চুরুট খেতেন। তিনি বিশ্বাস বলতেন চুরুট ছাড়া তিনি সৃজনশীল কাজ করতে পারেন না। এই অভ্যাসের চড়া মূল্য তাকে দিতে হয় ।

৬৭ বছর বয়সে মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি।এরপর বেঁচে ছিলেন প্রায় ১৬ বছর।এই ষোলো বছরে ৩৩টি অস্ত্রোপচার করা হয়।মুখের ভেতর তালুর উপরের দিক থেকে মুখের একটা পাশ প্রায় কেটে ফেলে দেয়া হয় তার।

মুখের তালু কেটে ফেলার ফলে ফ্রয়েডের মুখগহ্বর এবং নাকের গহ্বর এক হয়ে গিয়েছিল। তিনি খেতে বা কথা বলতে পারতেন না। এই গর্তটি ঢাকার জন্য তাকে একটি বিশাল, জটিল প্রস্থেসিস বা কৃত্রিম চোয়াল পরতে হতো, যা ভলকানাইট এবং সোনা দিয়ে তৈরি ছিল। ফ্রয়েড ঘৃণাভরে এই যন্ত্রটির নাম দিয়েছিলেন “দ্য মনস্টার”।

শেষের দিকে তার ক্ষত থেকে পচা মাংসের দুর্গন্ধ বের হতো, যা এতই তীব্র ছিল যে তার প্রিয় কুকুর লুন তার কাছে আসতে চাইত না। মশা-মাছি তাড়ানোর জন্য তার বিছানার ওপর মশারি টাঙিয়ে রাখতে হতো ।
এত কিছুর পরেও তিনি চুরুট খাওয়া ছাড়েননি। তিনি কাপড়ের ক্লিপ দিয়ে চোয়াল ফাঁক করে চুরুট ধরিয়ে রাখতেন। তিনি ব্যথানাশক ওষুধ নিতেও অনীহা প্রকাশ করতেন, কারণ তিনি চেয়েছিলেন তার মস্তিষ্ক যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সচল থাকে। তিনি বলতেন, “আমি যন্ত্রণার মধ্যে চিন্তা করতে পছন্দ করি, ঝিমিয়ে থাকতে নয়।”

Similar Posts

  • কবিতা যে কারণে

    শব্দের রাস্তা ধরে হাঁটতে গিয়ে,কবিরা যে হোঁচট খন তা’ই আসলে কবিতা। কবিতা সেই দুঃখবন,গাঢ় হয় রূপকে। আড়ালকে ভরসা করে যে কথাগুলো কবি বলেন সে কথাগুলো তেমনই থেকে যায়।পাঠকের কাছে যা পৌছায় তা পাঠকের নিজেরই কল্পনা অথবা অবচেতনের বিস্তার। কবিতা কোনও চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা বলেনা বরং সমূহ গন্তব্যের সম্ভাবনার কথা বলে । কবিতা বাস্তব নয় আবার…

  • থ্রু দ্য অলিভ ট্রি

    মন ভালো না লাগলে আমি আব্বাস কিয়ারোস্তামির “থ্রু দ্য অলিভ ট্রি” দেখি মাঝে মাঝে।একটা দৃশ্য শ্যুট করা হয়ে গেলে পুরো টিম যখন অন্য দৃশ্যের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সেই ব্যস্ততার মাঝখানে, যেন সময় একটু থেমে যায়-হোসেইন আর তাহিরাহ শ্যুট হওয়া দৃশ্যের মতোই সেঁটে থাকে।হোসেইন তাহিরাহকে খুব সাধারণ কিছু কথা বলে। এমন কথা, যেগুলো আলাদা করে শোনার…

  • মানুষ ও তার ধারণা

    ইউভাল নোয়া হারারি’র “স্যাপিয়েন্স” এবং “হোমোদিউস” যারা পড়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই মানবজাতির বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে হিউম্যানকাইন্ড” হিসেবে বিবেচিত হবার যে যাত্রা সেই যাত্রার ধারণা পেয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তার বই “নেক্সাস”-এ এই হিউম্যাকাইন্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন এবং আশন্কা উঠে এসেছে। কিন্তু আমরা আমাদের অজান্তেই “হিউম্যানকাইন্ড” পেরিয়ে “ট্রান্সহিউম্যানিজম” প্রবেশ করে গেছি।…

  • চলে যাবে বলে….

    তবু নিঃশব্দে থেকে যাবার মত চলে যাচ্ছো তুমি।কোনো গাঢ় জ্যোস্নার পথ ধরে।আমার ভেতরে কেবল তোলপাড়। আর যে কোনো ফেরা নেই!আমি জানি। আমি জানি, এই প্রস্থান অনিবার্য।এ এক একমুখী যাত্রা,ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে দিয়ে তুমি প্রবেশ করছো এমন এক নীরবতায়-যেখানে স্মৃতিও আর পৌঁছাতে পারে না। আমার কোনো ভাষা নেই,যা দিয়ে ফেরানো যেতো তোমাকে।সমস্ত চলে যাবার…

  • দূরের তুমি কাছেই বুঝি

    জাজবা সিনেমার শেষ দৃশ্যে ঐশ্বরিয়া যখন চলে যাচ্ছে তখন কেউ একজন ইরফান খানকে বলে- যেতে দিলে?ইরফান খান তখন বলে- মোহাব্বত হ্যায় ইসিলিয়ে জানে দিয়া,জিদ হোতি তো বাহোমে হোতি। ভালোবাসি তাই যেতে দিয়েছি,জেদ হলে জড়িয়েই থাকতাম। এমন প্রেমে রুমীর কবিতার কথা মনে পড়ে-ঠিক ভুলের ওপারে যে ময়দান,সেখানে আমাদের দেখা হবে। মনে পড়ে অমৃতা প্রীতমকে। মৃত্যু শয্যায়…

  • অন্তরীন:সিনেমার ভাষায় নীরবতা

    একটা উড়ো ফোনের ওপাশে এক নারী কন্ঠ খুব সহজাতভাবে জানতে চান-ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে? উত্তরে না বললে ফের বলে ওঠেন-নাহ,বেশ মজাতো।এখানে হচ্ছে,হাওয়াও দিচ্ছে।এবার এপাশ যখন প্রশ্ন করে আপনি কী চান?ওপাশের কন্ঠটি উত্তর দেয় -আমি কথা বলতে চাই। দৃশ্যটা মৃণাল সেনের অন্তরীণ সিনেমার।অন্তরীণ মানে আটকে থাকা,নিজের ভেতরে শৃঙ্খলিত হয়ে থাকা। নিজেকে বলবার আকুলতা মানুষের অনেকটা তৃষ্ণার মত।মানুষ…