ঋত্বিক ঘটক এবং একটি বিষন্ন জীবন

এই শহরে এতো দুঃখ কেনো হরিদাস?-বাড়ি থেকে পালিয়ে সিনেমার সংলাপ।

“কে চায় দুঃখ? জীবন দুঃখ নহে বীরত্ব। “সুরমা ঘটককে এক চিঠিতে লিখেছিলেন সুরমা।
সুরমা ঘটকের ঋত্বিক পড়ছিলাম। অনেক শিল্পী সাহিত্যিকের জীবন ঘেটে দেখেছি জীবনের এই অনিশ্চয়তা, অপ্রাপ্তি আর হতাশা একই। হয়তো প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন।

যুক্তি তক্কো গপ্পে বলেছিলেন- জীবন জীবিতের, জীবিতের ধর্ম বহতা অমোঘ দুর্নিবার। সব পুড়ছে, ব্রহ্মা- পুড়ছে, আমিও পুড়ছি।’ঋত্বিক নিজেকে বুঝতেই বোধহয় একনিষ্ঠ পাঠক হয়েছেন ইয়ুং্যের, দ্বারস্থ হয়েছেন মাইথোলজির। দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে ঋত্বিক বেরিয়ে আসতে পারেননি জীবনভর। তার মন ছুটে এসেছে বারবার জন্মস্থানের কাছে, নদীর কাছে, জলের কাছে। প্রথম ছবি “নাগরিক ” মুক্তির আলো দেখেনি। সুরমাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন – “জীবনের কাছে অনেক চাহিদা নিয়ে রওনা হয়েছিলাম। হায়রে নিজের ক্ষমতাকে মূল্য দিতে আজ আমি এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। “
আরেক চিঠিতে “পরিষ্কার মনে হচ্ছে আজ জীবনের পরিপূর্ণ ছন্দবদলের দরকার হয়ে পড়েছে। বাঁচতে হলে প্রডাক্টিভ মেম্বার অফ সোসাইটি হতে হবে। এটা বুঝিইনি। “
“মাসিক একটা আয়ের সংস্থান করা কর্তব্য। নয় জীবনে স্নিগ্ধতা আসবেনা “।

কোথায় যেনো পড়েছিলাম, মোৎজার্ট কোথাও একটা, তার অর্কেস্ট্রা টিম নিয়ে পরিবেশন করেছেন, একটা সিম্ফোনি কম্পোজিশন, সামনে লোকের মুহুর্মুহু হাততালি।তারা চিৎকার করছে লং লিভ মোৎজার্ট! আর মোজার্ট কানে শুনছেন লং স্টার্ভ মোজার্ট! তুমি না খেয়ে মরো!

সুবর্ণরেখার শুটিং্যের সময় ঋত্বিক রাত সাড়ে ন ‘ টার ট্রেনের অপেক্ষা করতেন! ট্রেন থেকে কোনও পরিচিত মুখ নামবে কি না, নামলেও ফিল্মের র ‘ স্টক আনবে কিনা! র ‘স্টকের জন্যে দিনের পর দিন আটকে থেকেছে শুটিং। এমন করেই কাজ করতে হয়েছে। যে কটা ছবি মুক্তি পেয়েছে সেগুলোর স্বত্ব পেতেও কেটে গেছে বহুবছর।জীবিত অবস্থায় কোনও পুরস্কার পাননি, জোটেনি কিছুই। সব রেখেও একরকম নিঃস্ব জীবন কাটিয়েছেন। যুক্তি তক্কো গপ্পে ‘র শুটিং্যের সময় নাকি ফুটপাতে ঘুমোতেন। নিজের উপর ক্ষোভ প্রকাশেই ধরেছিলেন মদ। সিগারেট, মদের পয়সার জন্যে হাত পাততে হয়েছে।
তিনি জানতেন অধিকার খর্বের রাজনীতিতে “নিরপেক্ষতা “র মতো মধ্যবিত্ত অভিমানের কোনও জায়গা নেই। তার ছবিগুলো তাই রাজনৈতিক স্টেটম্যান্ট হয়ে রইলো।

আহারে জীবন!কত তিক্ততার নদী বয় তার পাড় ধরে!

Similar Posts

  • নয় জীবন

    উইলিয়াম ডালরিম্পলের “নাইন লাইভস” -নয় জীবনের গল্প। প্রতিটি অধ্যায়ে একজন করে চরিত্র তার নিজের গল্প বলেছেন।এরা কাল্পনিক নয় রক্তে মাংসে বাস করা জীবন্ত মানুষ। সাক্ষাৎকার বলা হলেও আসলে আত্মকথনের ভঙ্গিমায়,তাদের ভাষ্যেই লিখেছেন ডালরিম্পল।তারা কেউ জৈন সন্ন্যাসী , কেউ সুফি দরবেশ ,কেউ তন্ত্রসাধক, কেউ বা তিব্বতি ভিক্ষু ।এই মানুষদের জীবনে ধর্ম কেবল বিশ্বাস নয়, আশ্রয়, অস্তিত্ব,…

  • ব্রোথেল অথবা বিধ্বস্ত জীবন

    প্রেমিকার বুক থেকে মুখ তুললেই পৃথিবীটাকে একটা ব্রোথেল মনে হয়  আমার মা একটা থালায় ভাত মাখতে থাকেন বাবার ওষুধের স্ট্রীপগুলো হয়ে ওঠে ভুবুক্ষ দানব বোনের গা থেকে খসে যেতে চায় ডুরে শাড়ির আঁচল জীবন খড়ের মাঠবিধ্বস্ত সমস্ত ফসল নিয়ে আমি দিগ্বিদিক হাঁটি লম্পট আহ্লাদ আর মাসকাবারি ঠোঙারউজাড় করা দুর্ভিক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকি  ভাবি  দীর্ঘ হোক বাড়ি ফেরার পথ পকেটে হলদেটে…

  • ঘুমহীনতার শহর ও স্মৃতির বিস্মৃতি: মাকোন্দো থেকে নিউরোসায়েন্স

    গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস “নিঃসঙ্গতার একশ বছর”-এর শহর মাকোন্দো।পুরো মাকোন্দোবাসীর এক আজব রোগে আক্রান্ত হলো,অনিদ্রা।  মাকোন্দো শহরে বুয়েন্দিয়া পরিবারে হাজির হয় একটি ছোট্ট মেয়ে রেবেকা, যার বাবা-মার কথা এই পরিবারের কেউ মনে করতে পারে না। এই বহিরাগত, অপরিচিত রেবেকাই প্রথম আক্রান্ত হয় অনিদ্রায়। সবার আগে তা বুঝতে পারে বাড়ির পরিচারিকা আদিবাসী বিসিতাসিয়োন এবং সবাইকে সে…

  • শিরি – ফরহাদ

    ছোটবেলায় শিরি-ফরহাদের অলৌকিক প্রেমের গল্প শুনতাম।শিরির গায়ে আঘাত করলে নাকি ফরহাদের শরীরে সেই আঘাত ভেসে উঠতো। গতকাল থেকে প্রচন্ড জ্বর।আমি জানতাম ঠিক আমার সহ-জনও অসুস্থ হবেন।আমি অসুস্থ হলে নির্ঝরেরও আর শরীর চলেনা।এই যুগের শিরি-ফরহাদ! শিরিন ছিলেন এক আরমেনীয় রাজকুমারী।সৌন্দর্যে অপূর্ব, গুণে অতুলনীয়। তার রূপের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। পারস্যের রাজপুত্র খসরু (বা খসরু পারভেজ) তার…

  • রেঁনে ম্যাগরিথ

    চিত্রকর্মের নাম -দি লাভার।রেঁনে ম্যাগরিথের আঁকা।আমার বড় প্রিয়। দুটি মানুষের চুম্বনের দৃশ্য,কিন্তু তাদের মুখ ঢাকা সাদা কাপড়ে।প্রথম দেখায় অদ্ভুত লাগে, কিছুটা অস্বস্তিকরও।পরক্ষণেই মানুষের সম্পর্কের গভীরে থাকা সেই পুরনো সত্য আরো প্রকট হতে থাকে।মানুষ যতই কাছে আসে,তত একে অপরকে আর দেখতে পায়না।চোখের এতো কাছে,যে দৃশ্যত আড়াল হতে থাকে। শঙ্খ ঘোষের সেই কবিতার লাইনগুলো মনে আসে-কে কাকে…

  • আত্মজাগরণের নির্জন করিডোর”

    “আমি একা” এই বাক্যটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে  এক ধরনের দুঃখ, অসহায়ত্ব বা বিচ্ছিন্নতার অনুভব জেগে ওঠে। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, একা থাকা মানেই যেন অপূর্ণতা। যেন জীবনের সার্থকতা কেবল সম্পর্ক, সংযোগ, ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভেতরেই নিহিত।  মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী।বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষ বাস করে জোটবদ্ধ এক সামাজিক পরিস্থিতিতে।যার অকেকখানিই নির্ভর করে থাকে চাহিদা,নিরাপত্তা,প্রত্যাশার উপর।…