মানুষের সৌন্দর্য তার দেখবার দৃষ্টিতে

মানুষের সৌন্দর্য বিষয়টা যতোটা না নির্ভর করে তার বাহ্যিক অবয়বের উপর তারচেয়ে বেশী নির্ভর করে যে দেখছে তার দেখবার ভঙ্গির ওপর।রবীন্দ্রনাথের বলা-অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা সেই ভঙ্গিমার কথাই বলে। মূলত কোনো মানুষের নিজস্ব কোনো নিখুঁত রূপ থাকে না,আমাদের দেখার ভঙ্গি ও মনস্তত্ত্বই তাকে অপরূপ করে তোলে। যখন আমরা কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসি, তখন কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে তার বাহ্যিক অবয়ব দেখি না। আমরা তাকে দেখি আমাদের সমস্ত আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং অস্তিত্বের গভীরতা দিয়ে।আমরা তাকে সাজাই আমাদের সমস্ত কল্পনাকে ঢেলে।

আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ একদিন কায়েস নামের এক কবির কথা জানতে পারলেন। মানুষ তাকে ডাকে মজনু বা পাগল বলে।কারণ সে তার প্রেমিকা লায়লার বিরহে আক্ষরিক অর্থেই উন্মাদ হয়ে গেছে।
এ কথা শুনে খলিফার মনে তীব্র কৌতূহল জাগল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, এই লায়লা নিশ্চয়ই অন্য সব সাধারণ নারীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা! হয় সে অভাবনীয় রূপসী, নয়তো অলৌকিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী, অথবা নিশ্চয়ই সে কোনো জাদুমন্ত্র জানে!
লায়লাকে দেখার জন্য খলিফা অধীর হয়ে উঠলেন। অবশেষে একদিন লায়লাকে তিনি তার রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠালেন।খলিফার সামনে এসে দাঁড়াল লায়লা, তার মুখ এক বিরাট ঘোমটায় ঢাকা।খলিফা তার মুখ দেখার জন্য অধৈর্য্যে হয়ে উঠলে,ধীরে ধীরে লায়লা ঘোমটা থেকে সরিয়ে নিল ।
কিন্তু লায়লাকে চোখের সামনে দেখে খলিফা চরম হতাশ হলেন। এ তো রক্তে-মাংসে গড়া নিতান্তই সাধারণ এক মানবী! তার মধ্যে কোনো জাদুকরী মোহ নেই, নেই কোনো অপ্সরী-অনিন্দিত রূপ বা অলৌকিক আভা। আর দশজন মানুষের মতোই সেও দোষে-গুণে গড়া এক সাধারণ নারী।
হতবাক খলিফা বিস্ময় লুকাতে না পেরে বলেই ফেললেন,
তুমিই কি সেই লায়লা, যার জন্য মজনু এমন পাগলপ্রায়? তোমাকে তো দেখতে একেবারেই সাধারণ মনে হচ্ছে! তোমার মাঝে এমন কী বিশেষত্ব আছে?
লায়লা অত্যন্ত শান্ত ও ধীর স্বরে উত্তর দিল—
হ্যাঁ, আমিই সেই লায়লা। কিন্তু আপনি তো মজনু নন! আমার বিশেষত্ব বুঝতে হলে আপনাকে মজনুর চোখ দিয়ে আমাকে দেখতে হবে। তা না হলে আপনি কখনোই বুঝবেন না, আমার মাঝে ঠিক কী আছে!

অস্তিত্ববাদ বলে-এই পৃথিবীতে কোনো কিছুরই নিজস্ব বা পূর্বনির্ধারিত কোনো অর্থ নেই। আমরা মানুষরাই আমাদের চারপাশের পৃথিবী ও মানুষদের অর্থ প্রদান করি।

খলিফার কাছে লায়লা নিতান্তই সাধারণ, কারণ খলিফা লায়লার অস্তিত্বে কোনো অর্থ আরোপ করেননি। কিন্তু মজনু তার নিজের জীবনের পুরো অর্থটাই খুঁজে পেয়েছেন লায়লার মাঝে। মজনুর কাছে লায়লা আর দশজন মানুষের মতো নন, বরং লায়লাই তার পুরো পৃথিবী, তার অস্তিত্বের একমাত্র কারণ।

Similar Posts

  • মৃন্ময় সুখ

    একটা রাত কাটিয়ে যেও শিয়রেদেখবে কী অনাদরে নিঃশ্বাস পরে থাকে পোষা বালিশেখসে যাওয়া তারার খোসায় চাওয়ার জীবাশ্ম আগলে রাখা দৃশ্যপটকেওকী অমূলক, অসহায় দেখায়দেখবে তুমি-এই অন্ধকারে রোজ মৃত্যু নিয়ে দাঁড়িয়েছি আমিদরোজায় হাইড এন্ড সী খেলায় নিজের ভেতর ডুবে গেছে যেতাকে কোনোদিন ডাকেনি কেউতাকে ফিরিয়ে দিয়েছে মৃণ্ময় সুখতোমার জন্য লিখে রেখেছে সে চিরহরিৎ জীবনপেতে দিয়েছে পর্নমোচি বুক…

  • হেরে গিয়ে জিতে যাবার চেয়ে বড় জিতে যাওয়া হয়না

    এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হার হচ্ছে ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়া।কেউ আপনাকে এতোটা ভালোবাসছে যে ভালোবাসা আপনি তাকে কখনও বাসতে পারবেন না,এই হারের চেয়ে সুন্দর হার আর নেই। পৃথিবীর সমস্ত অভিধানে ‘হার’ শব্দটির অর্থ পরাজয় বা ব্যর্থতা হলেও কেবল প্রেমের অভিধানে এর অর্থ জিতে যাওয়া।এর অর্থ সাফল্য।একটু ভালোবাসার বদলে অঢেল ভালোবাসা ফিরে আসার মত বিজয়। ভালোবাসা…

  • শব্দের গতি

    ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার “কোলাহল” শব্দটা নিয়ে আক্ষেপ করে বলেছছিলেন শব্দটাকে আমরা এতো ভীতি দিয়ে মুড়ে দিয়েছি!বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যারা তাদের সহজ অর্থ হারিয়ে ,ভয়বোধক দ্যোতনার প্রতিফলন হয়ে গেছে। যেমন-ভিড়,একা,কোলাহল,নিঃসঙ্গতা,নিস্তব্ধতা,অন্ধকার এমন আরও বহু শব্দ! সক্রেটিস বলেছিলেন,ভাষার অপব্যবহার আত্মায় দানবের জন্ম দেয়।তিনি ব্যাকরণের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা বোঝাননি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন ভাষার সত্যকে অস্বীকার করে…

  • যাপিত অক্ষরমালা

    চিঠির পৃষ্ঠা থেকে ক্রমশ ঝুলে পড়েছে অক্ষরমালাযেনো এরচেয়ে সহজ গন্তব্য নেইনাবছে দুপুর অতৃপ্তির কোষাগারকোথাও সূর্য শকুনের ডানার কাছাকাছিকোথাও চাঁদ বনের উচু গাছের মিত্রএতো উচ্চতাপ্রিয় ধারণায় আমি নিম্নগামী বিন্দুছিটকে গেছি বৃত্তের বর্তূল ঘূর্ণনেআমি প্রেমিকপ্রেমের তরল থেকে জীবন নিংড়ে নিতে ভুল করে গলে গেছি সাবানের ফেনায়উঠে গেছিস তুই যেনো পূণ্য হলো স্নানবুঝি কবিতা ছলে তোর হাত ধরতে…

  • মানুষ

    আমার যে বন্ধুটি আত্মহত্যা করেছিলোসে বলতো-কেউ কেউ মানুষ হয়! মানুষগুলো ঘুড়ির মতোসুতো কেটে গেলেই মুখ থুবড়ে পড়ে হারিয়ে যায়ফানুসের মতো উড়ে যায়,ফুরিয়ে যায়! আমার সেই বন্ধুটি সুতো কাটা ঘুড়ির মতো মুখ থুবড়ে পড়েছিলোহারিয়ে গিয়েছিলো,ফানুসের মতো উড়ে গিয়েছিলো, ফুরিয়ে গিয়েছিলো। .সেদিন সবাই আফসোস করতে করতে বলেছিলো আহা! শেষে কিনা নিজেই কেড়ে নিলো নিজের প্রাণকেবল আমিই জেনেছিলাম জীবন কেড়ে…

  • নাকছাবি

    কুপির আলোয় নাকছাবিডার দিকে চাইয়া থাকিরাইত বাড়নের লগে লগে কইলজার ভিত্রে তুমি জিওল মাছের লাহান উছলাওআমারে এমুনতরো এক্লা লাগে ক্যান?বড় পাগল পাগল লাগেবুকের ভিত্রে উছলায় তিন পরাণের গাঙরাইতগুলা রাক্ষসের লাহান আমারে খায়া ফালাইতে চায়!আন্ধারের লগে কথা কইতে কইতেতুমার কিচ্ছা হুনাইতে হুনাইতেআমি খালি উতলা হইআসমানের কাঁন্দনের লগে আমিও কাঁন্দিনিজেরে নিজেই কই-আমার একখান চাওয়া আছিলো, হুনবা?একটা জীবন…