মানুষ ও তার ধারণা

ইউভাল নোয়া হারারি’র “স্যাপিয়েন্স” এবং “হোমোদিউস” যারা পড়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই মানবজাতির বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে হিউম্যানকাইন্ড” হিসেবে বিবেচিত হবার যে যাত্রা সেই যাত্রার ধারণা পেয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তার বই “নেক্সাস”-এ এই হিউম্যাকাইন্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন এবং আশন্কা উঠে এসেছে।

কিন্তু আমরা আমাদের অজান্তেই “হিউম্যানকাইন্ড” পেরিয়ে “ট্রান্সহিউম্যানিজম” প্রবেশ করে গেছি।

এই আলাপের গভীরে যেতে প্রথমে জানতে হবে “হিউম্যান কাইন্ড” আসলে কী?
“হিউম্যান কাইন্ড”- আসলে একটি দর্শন। যেই দর্শন বলছে -মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের আজকের কাজের ওপর।”
প্রস্তার যুগ থেকে শিল্প বিপ্লব কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশকালকে আমরা “হিউম্যাকাইন্ড” বলছি।এবং এখনও বলে যাচ্ছি।

কিন্তু এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ এখন যে পর্যায়ে আছে, অনেক বিজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞ মানুষেরা মনে করছেন যে ভবিষ্যতে আমরা মানব সভ্যতার অন্য এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছি যাকে বলা হচ্ছে “ট্রান্সহিউম্যানিজম” বা “হিউম্যান ২.০”।

এই ট্রান্সহিউম্যানিজম আসলে কী?

প্রখ্যাত ট্রান্সহিউম্যানিস্ট ম্যাক্স মোর নামের এক ভদ্রলোক বলছেন-
ট্রান্সহিউম্যানিজম হলো একটি প্রযুক্তিনির্ভর দর্শন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মানব অবস্থা মৌলিকভাবে উন্নত করার সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।

আমরা ইতোমধ্যে ট্রান্সহিউম্যানিজমে প্রবেশ করে গেছি।যেটা আমাদের বোধগম্য হচ্ছেনা।

প্রফেসর সুসান বি. লেভিন একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন যার নাম “The Less Visible Side of Transhumanism Is Dangerously Un-radical”।
সেখানে তিনি বলছেন যে—ট্রান্সহিউম্যানিস্ট মূল্যবোধ ইতিমধ্যেই আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে চারটি দিক দিয়ে।সেই দিকগুলো-
প্রথমটা ,বয়স-প্রতিরোধ ও অ্যান্টি-এজিং আসক্তি।এরপর আসছে,পারফেকশনিজম বা নিখুঁত হওয়ার প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া।
তরুণ মানেই স্বাস্থ্যবান—এই ধারণা (অর্থাৎ বয়স হওয়াকে রোগ ভাবা)।এবং সবশেষে ,সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তির ওপর চূড়ান্ত নির্ভরতা।

এছাড়াও তিনি বিদ্যমান আরও উপাদান নিয়ে আলোচনা করেছেন।কিন্তু এই চারটা একদম প্রকট,খালি চোখে দেখা যাবার মত।
চারপাশে তাকালেই দেখা যায়-
আমরা কেউ বুড়ো হতে চাইছিনা,সবসময় ষোলো থাকার কিংবা বত্রিশ থাকার প্রয়াসে ঝুঁকছি এন্টিএইজিং ইন্ডাস্ট্রির দিকে,সব ,সব নিখুঁত চাইছি।ফিট থাকতে জিমে দিন রাত পার করে দিচ্ছি এবং সফলও হচ্ছি।কে যে পঞ্চাশ আর কে ত্রিশ এখন আর ঠিক ঠাহর হয়না।সবশেষে ,যেকোনো সমস্যার সমাধানে গুগোল মামা।
খুব বড় উদাহরণ লাগছেনা,এই সবগুলো উদাহরণের দিকে তাকালেই দেখবেন প্রযুক্তির প্রভাব এ জীবনে কত!

ট্রান্সহিউম্যানিজমে আপনাকে স্বাগত!

Similar Posts

  • দুঃখের সাময়িক অনুপস্থিতি সুখ

    সেদিন একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম ইউভাল নোয়া হারারির।তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যদি আপনি নিহিলিস্ট না হন,আপনি কি বিশ্বাস করেন জীবনের উদ্দেশ্য আছে? হারারি অনেক শব্দে যে উত্তর দিলেন তার মর্ম দাঁড়ায়-জীবনের মানে দুঃখকে বোঝা এবং তা থেকে মুক্ত হওয়া। তিনি আরও যা বলছিলেন তার অর্থ ,মানুষের প্রথম উপলব্ধি হওয়া উচিৎ দুঃখ অবশ্যম্ভাবী নয়,আপনি এ সম্পর্কে কিছু…

  • উৎপল কুমার বসুর একটা লাইন আছে- আমার আত্মার চেয়ে সহজ চাতুর্যময় তোমার চলে যাবার ভঙ্গি।আমি সেই লাইনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকি। দেখি ভাদ্রের মেঘে মেঘে বিদ্যাপতির-এ ভরা বাদর, মাহ ভাদরশূন্য মন্দির মোর। আমি দেখি আমার টানা বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে। ভাস্কর চক্রবর্তী বলছেন- যে বিকেলে জ্বর আসে তুমি তার মত করে দাঁড়িয়েছো। সরে এলে কিছু, দেখি…

  • হারাই হারাই সদা করি ভয়

    ঋতুপর্ণ ঘোষের আবহমান সিনেমার একটা দৃশ্য আছে যেখানে মমতাশংকর দিপংকরকে আক্ষেপ করে বলছেন-আমি তোমার নায়িকা হতে পারলাম না,প্রেমিকা তো হতে পারতাম।আমি সোজা তোমার বউ হয়ে গেলাম।দুজনে মিলে লুকিয়ে সিনেমা দেখলাম না,বাড়িতে মিথ্যে কথা বলে দীঘায় ঘুরতে গেলাম না।কেউ আপত্তি করলোনা,কেউ বারণ করলোনা! সহজে পাওয়া যায় এমন কিছুর প্রতি মানুষের সহজাত অবহেলা থাকে।অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান…

  • কবিতা যে কারণে

    শব্দের রাস্তা ধরে হাঁটতে গিয়ে,কবিরা যে হোঁচট খন তা’ই আসলে কবিতা। কবিতা সেই দুঃখবন,গাঢ় হয় রূপকে। আড়ালকে ভরসা করে যে কথাগুলো কবি বলেন সে কথাগুলো তেমনই থেকে যায়।পাঠকের কাছে যা পৌছায় তা পাঠকের নিজেরই কল্পনা অথবা অবচেতনের বিস্তার। কবিতা কোনও চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা বলেনা বরং সমূহ গন্তব্যের সম্ভাবনার কথা বলে । কবিতা বাস্তব নয় আবার…

  • অন্তরীন:সিনেমার ভাষায় নীরবতা

    একটা উড়ো ফোনের ওপাশে এক নারী কন্ঠ খুব সহজাতভাবে জানতে চান-ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে? উত্তরে না বললে ফের বলে ওঠেন-নাহ,বেশ মজাতো।এখানে হচ্ছে,হাওয়াও দিচ্ছে।এবার এপাশ যখন প্রশ্ন করে আপনি কী চান?ওপাশের কন্ঠটি উত্তর দেয় -আমি কথা বলতে চাই। দৃশ্যটা মৃণাল সেনের অন্তরীণ সিনেমার।অন্তরীণ মানে আটকে থাকা,নিজের ভেতরে শৃঙ্খলিত হয়ে থাকা। নিজেকে বলবার আকুলতা মানুষের অনেকটা তৃষ্ণার মত।মানুষ…

  • হেরে গিয়ে জিতে যাবার চেয়ে বড় জিতে যাওয়া হয়না

    এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হার হচ্ছে ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়া।কেউ আপনাকে এতোটা ভালোবাসছে যে ভালোবাসা আপনি তাকে কখনও বাসতে পারবেন না,এই হারের চেয়ে সুন্দর হার আর নেই। পৃথিবীর সমস্ত অভিধানে ‘হার’ শব্দটির অর্থ পরাজয় বা ব্যর্থতা হলেও কেবল প্রেমের অভিধানে এর অর্থ জিতে যাওয়া।এর অর্থ সাফল্য।একটু ভালোবাসার বদলে অঢেল ভালোবাসা ফিরে আসার মত বিজয়। ভালোবাসা…