বাবা ফরিদ গঞ্জেশকার
আমার সারা দেহ,খেয়ো গো মাটি…এই চোখ দুটো মাটি খেয়ো না।
আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ,মিটবে না গো মিটবে না।
তারে এক জনমে ভালোবেসে,ভরবে না মন ভরবে না।-গানটা খুব ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি।আমাদের দেশের গুণী সুরকার,গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা এবং সুরে গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর।নয়নের আলো সিনেমার গান,আমার বড় পছন্দের গান,প্রিয় গান।
বহুবছর পর যখন রকস্টার সিনেমাটা দেখেছি,সেখানে ইরশাদ কামিলের লেখা এবং এ আর রহমানের সুরে নাদান পারিন্দে গানের –
কাগারে কাগারে মোরি ইতনি আরাজ তুছে
চুন চুন খাইয়ো মান্স
আরাজিয়ারে খাইয়োনা দো ন্যায়না মোরে
পিয়াকে মিলান কে আস।-এই লাইনগুলোতে আটকেছি।যার অর্থ করলে দাঁড়ায়- কাক ও কাক আমার এইটুকু চাওয়া তোমার কাছে
বেছে বেছে খেয়ো মাংস
যেনো অক্ষত থাকে আমার দুটো চোখ,প্রিয়কে দেখার আশা।
আমি অবাক হয়ে দুটো গানের এই লাইনগুলোতে ঘুরপাক খেয়েছি বারংবার।
কী বিধ্বংসী কথা,কান পেরিয়ে কেমন মজ্জায় ছড়িয়ে যায়।সারা দেহ কেমন হাহাকার করে ওঠে এই ভেবে মৃত্যুর কাছে মুছে যাবার কাছে এমন আশাও থাকে জীবনের!

সেদিন রকস্টারের গানগুলো নিয়ে লক্ষ্য মাহেশ্বরীর একটা ট্রিবিউট দেখছিলাম।সেখান থেকে জানতে পারলাম ওই লাইন দুটো আসলে একজন সুফির।যিনি বাবা ফরিদ নামে পরিচিত।
নাহ তিনি ফরিদুদ্দিন আত্তার নন।তিনি ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার।এই লাইনগুলোর বয়স প্রায় ৪০০ বছর!
বাবা ফরিদ বিশ্বাস করতেন দুঃখ-যাতনার শেষ সীমানায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারলেই সেই সীমানার পাড়েই খোদার দেখা পাওয়া যায়।তিনি নিজেকে তাই ব্যথায় রাখতেন,পাথরের মত শক্ত রুটি চিবিয়ে খেতেন।বলতেন-নরম রুটি খাবো?আমার মন যে পাথর হয়ে যাবে!
বাবা ফরিদ নিজেকে বেঁধে নিজেই কুয়োর মধ্যে উল্টো ঝুলিয়ে রাখতেন সপ্তাহ ধরে।নিজেকে ব্যথায় রাখতেন।
নব্বই বছর যখন বয়,শরীর প্রায় নিঃশেষ,নিস্তেজ।সেই কুয়ার পাশেই শরীরটা যখন পরে আছে,মাংসপেশীতে মোটেও প্রাণ নেই আর যে হাত তুলা যাবে।তখন চারপাশে তাকে ঘিরে আছে অজস্র কাক এই অপেক্ষায় বাবা ফরিদের দেহ থেকে প্রাণটা গেলেই খুবলে খাওয়া যাবে।তখন বাবা ফরিদ বলেছিলেন- কাগারে কাগারে মোরি….সব খেয়ো শুধু চোখ দুটো খেয়োনা…
আহারে..আহারে…
জানতে গেলে কত ছোট ছোট কথা,লাইনও অর্থবহ হয়ে ওঠে।পর্দা সরালে যেমন অন্য এক সকাল হেসে ওঠে একই রকম জীবন নতুন নতুন গল্প বলে!