নিজেকে নিয়ে নিজের দিকে যাত্রা

ইউভাল নোয়া হারারি  তার ” টুয়েন্টি ওয়ান লেসন ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ” বইয়ে এক জায়গায় বলেছেন –

“যদি মশা আমাদের কানের কাছে ভনভন করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, আমরা সহজেই জানি কীভাবে তা মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু যদি কোনো চিন্তা আমাদের মনে ভনভন করে এবং রাতে ঘুমাতে না দেয়,আমরা বেশিরভাগ মানুষই জানি না কীভাবে সেই চিন্তাকে থামাতে হয়।”

কথাটা খুব সত্যি না?

অর্থাৎ বাইরের অনেক কিছু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে,সামলাতে জানলেও আমরা জানিনা নিজের মনকে ,চিন্তাকে কীভাবে সামলাতে হয়!

মানব মনের প্রকৃতি এমন যে এটি সবসময় চিন্তা, অনুভূতি এবং স্মৃতির ভেতর ঘোরাফেরা করে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক বিশাল অংশ অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, বর্তমানের জটিলতা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। 

এই মানসিক প্রক্রিয়া আমাদের মানসিক শান্তি নষ্ট করে এবং আমাদের বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত থাকার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করে। 

তবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আধ্যাত্মিকতার একটি গভীর পর্যায় রয়েছে, যাকে বলা হয় “নো-মাইন্ড”। এই অবস্থাটি হচ্ছে মনের সে অবস্থা-যা চিন্তা এবং বিচার থেকে মুক্ত হয়ে অন্য এক উচ্চতর অবস্থায় পৌঁছানোর আধ্যাত্মিক চর্চা হিসেবে পরিচিত।

নো-মাইন্ড’ শব্দটি এসেছে মূলত জেন দর্শনের “Mushin no shin” থেকে, যার মানে দাঁড়ায়– “মনহীন মন”। এর অর্থ, এমন এক মন, যা চিন্তা বা আবেগ দ্বারা আবদ্ধ নয়, সম্পূর্ণ খোলা — গ্রহণশীল। সংস্কৃতে একে বলা হয় ‘অমানিভাব’ (Amani-Bhava), যা বেদান্ত দর্শনে ব্যবহৃত হয়।

অমানিভাব’ অর্থ কেবল চিন্তাহীন মন নয়, বরং এমন একটি শান্ত চেতনা  যা জন্ম নেয় তখনই, যখন উপলব্ধি আসে যে “আমি ব্রহ্ম” এবং “যা কিছু দেখা যায় তা মিথ্যা (অস্থায়ী)।” 

সেই মানসিক স্থিতি তখন চিন্তামুক্ত ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন মনের মধ্যে  জগৎ সম্পর্কিত কোনো চিন্তা থাকেনা, থাকেনা আত্মসম্পর্কিত। 

এমন গভীর স্থিরতা, এমন নিরবতা যার মধ্যে আত্মজ্ঞান জন্ম নেয় — একে বলে ‘আমানিভাব’। এটাই সরাসরি আত্ম উপলব্ধির বা ‘অ-পরোক্ষানুভূতির’ দরজা।

আর এই সব ধারণার সংমিশ্রণ এই “নো-মাইন্ড”।

নো-মাইন্ড আসলে কি?

নো-মাইন্ড বলতে বোঝায় এমন এক ধরনের মানসিক অবস্থা, যেখানে আমরা চিন্তা ও আবেগের প্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকে কেবল তাদের পর্যবেক্ষণ করি। 

এটি সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত হওয়া বোঝায় না, বরং চিন্তার প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার একটি অবস্থা, যেখানে মন চিন্তাভাবনার জগতে ঢুকে যায় না, বরং চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেকে স্থিতিশীল ও সজাগ রাখে।

বিষয়টা অনেকটা সেই শান্ত,স্বচ্ছ হ্রদের মত।যেখানে আশপাশের পরিবেশের প্রতিবিম্ব তো তৈরী হয়।কিন্তু প্রতিবিম্বের উৎসে সৃষ্ট আলোড়ন সেই জলে অনুভূত হয়না।সেই জল তার ধর্ম বজায় রেখে শান্ত,স্থির থাকে।

জেন, তাওবাদ এবং অদ্বৈত বেদান্তে থেকেই মূলত “নো-মাইন্ড” অবস্থার জন্ম। এর মূলমন্ত্র হলো—মনকে নিরপেক্ষ এবং শান্ত রেখে জীবনকে প্রবাহিত হতে দেওয়া।

নো-মাইন্ডের মূল নিয়ামকগুলো এসেছে প্রধানত জেন ধর্ম,তাওবাদ,অদ্বৈত বেদান্ত থেকে।

জেন ধর্ম থেকে এসেছে- মনকে অতীত বা ভবিষ্যতের চিন্তায় আবদ্ধ না রেখে শুধু বর্তমানের মুহূর্তে থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়। 

তাওবাদও একই ধারণা বহন করে আরও কিছুটা সম্প্রসারিত করে-

 জলের মতো নমনীয়তা এবং বর্তমানের সাথে সংযুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। 

অদ্বৈত বেদান্ত মতে, চেতনা হলো আমাদের আসল স্বভাব, আর চিন্তা হলো একটি বাইরের প্রভাব, যা আমাদের সত্যিকারের স্বভাবকে আড়াল করে। 

নো-মাইন্ড অবস্থা হলো সেই সত্যিকারের স্বভাবের সঙ্গে সংযুক্তি, যেখানে চিন্তা বা আবেগের কোনো প্রভাব নেই। 

এই তিনের মিশেলেই আসলে “নো -মাইন্ড”।

নো-মাইন্ড অবস্থা অর্জনের মাধ্যমে আমরা মানসিক প্রশান্তি ও গভীর স্থিরতা লাভ করতে পারি। 

নো-মাইন্ড চর্চা আসলে আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।এই চর্চা শেখায় কীভাবে ভাবনার ভেতরে থেকেও যেকোনো সময় ভাবনার গায়ে ফুলস্টপ বসিয়ে নিজের বর্তমানে ফেরা যায়।আর এইটুকু আয়ত্ব করতে পারলেই  স্ট্রেস এবং উদ্বেগ অনেকখানি কমে যায়।

যখন মন চিন্তার জটিলতায় আবদ্ধ থাকে না, তখন আরও সৃজনশীল হতে পারে। নতুন ধারণা এবং সৃজনশীল চিন্তার জন্য মনের ভেতর একটা ফাফাঁকা জায়গা ভীষণ প্রয়োজন।

যেকোনো চর্চার শুরুটাই হয় আত্মোপলব্ধি দিয়ে।যেই মূহুর্তে আপনি আপনার চিন্তা নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন সেই মূহুর্তেই একটা আত্মোপলব্ধি ঘটে।

 কিভাবে নো-মাইন্ড চর্চা করা যায়?

নো-মাইন্ড চর্চা করার জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি আছে। কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর ধ্যান,মনোযোগ এবং গ্রহণ।

*ধ্যান বা ম্যাডিটেশন:প্রতিদিন কয়েক মিনিট ধ্যান করা নো-মাইন্ড অবস্থা অর্জনের প্রথম ধাপ হতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে নিজের চিন্তাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে শিখতে হবে। তবে কোনো চিন্তায় জড়িয়ে না গিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়াই মূল লক্ষ্য হবে।

*মনোযোগ বা মাইন্ডফুলনেস: বর্তমানে (মানে এখন আপনি কী কছেন?খাচ্ছেন?বসে আছেন?বই পড়ছেন,কথা বলছেন অরঅর্থাৎ যা করছেন সেই কাজে) সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করার মাধ্যমে নো-মাইন্ড চর্চা করা সম্ভব। যেকোনো কাজ, যেমন হাঁটা, খাওয়া বা শোনা, মনোযোগের সাথে করলে মনের স্থিতি আসে। 

*গ্রহণ করা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গ্রহণ করা।যা যেমন ঘটছে,হচ্ছে,তাকে সেভাবেই গ্রহণ করা।নিজের দিকে আহত না হয়ে সহজভাবে গ্রহণ করা।যতো সহজে প্রবাহকে গ্রহণ করা সম্ভব হবে ততো শান্তি খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

মনে রাখতে হবে, “নো মাইন্ড” অবস্থায় পৌঁছানো একটি যাত্রা, কোনো গন্তব্য নয়।

এক ,দুইদিনে আপনি পৌঁছেও যাবেন না সেখানে।ধীরে ধীরে এগুতে হবে,নিজেকে নিজের ব্যাপারে সচেতন করার মাধ্যমে।

অনেক সময় এমন হবে যখন মন চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে পড়বে।

কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনে ধীরে ধীরে আপনি ছেড়ে দিতে এবং সেই স্থিত সচেতন অবস্থায় ফিরে আসতে শিখবেন।

“নো মাইন্ড” চর্চা,আপনাকে অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করতে, জীবনকে সহজে গ্রহণ করতে এবং এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও শান্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সাহায্য করবে।

হয়তো একদিন আপনি নিজেই নিজেকে বলবেন-

গভীর শ্বাস নিয়ে, প্রতিরোধ ছেড়ে দিয়ে,  জলের মতো হয়ে– নমনীয়, স্থিতিশীল আর অনুগ্রহের সাথে প্রবাহিত হও।

Similar Posts

  • লায়লা মজনু

    পারস্যের সপ্তম শতকের একজন কবি যার নাম কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ।যার প্রেম কাহিনী পারস্যের লোককাহিনী হয়ে ঘুরে ফিরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।পরবর্তীতে নিজামী গঞ্জভী – রচিত এক মহাকাব্য এই কিংবদন্তিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে। কী?-এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই চেনা যায়নি কায়েস ইবনে-আল মুলাওয়াহকে।কিন্তু জানেন কী,ইনি আমাদের খুব পরিচিত একজন! খুলে বলছি। লায়লা-মজনুর নাম জানেন না এমন কী কেউ…

  • ব্রোথেল অথবা বিধ্বস্ত জীবন

    প্রেমিকার বুক থেকে মুখ তুললেই পৃথিবীটাকে একটা ব্রোথেল মনে হয়  আমার মা একটা থালায় ভাত মাখতে থাকেন বাবার ওষুধের স্ট্রীপগুলো হয়ে ওঠে ভুবুক্ষ দানব বোনের গা থেকে খসে যেতে চায় ডুরে শাড়ির আঁচল জীবন খড়ের মাঠবিধ্বস্ত সমস্ত ফসল নিয়ে আমি দিগ্বিদিক হাঁটি লম্পট আহ্লাদ আর মাসকাবারি ঠোঙারউজাড় করা দুর্ভিক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকি  ভাবি  দীর্ঘ হোক বাড়ি ফেরার পথ পকেটে হলদেটে…

  • মানুষ

    মন সরে গেলে স্মৃতি থেকে যায়। সেখানে সাঁতার কাটে চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস। সময়ের জালে নিজেকে জড়াতে জড়াতে আরও অস্ফুট হয়ে ওঠে মানুষ। মানুষই মানুষকে ছেড়ে যায়। আবার মানুষই অপেক্ষা করে দরোজা খুলে। যে মানুষটা ছেড়ে গেলো তার উপর বিশ্বাস হারিয়ে আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে মানুষ। রাস্তার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে আবারও নতুন করে চাইতে…

  • আকাশ সমাধি

    মৃত্যু হলে মৃতের সৎকার করা হয়।বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্নরকম রীতি।আমি ভাবতাম আচার যত ভিন্নই হোক মৃতকে কেবল মাটিতে সমাধি দেয়া হয় বা দাহ করা হয়।কিন্তু আকাশ সমাধির কথা শুনেছেন? জরুথ্রস্ত ধর্মে (যা আজও ইরান ও ভারতীয় পারসি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত), মৃতদেহকে “অশুচি” বা নাসু হিসেবে গণ্য করা হয়।বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যু একটি দানবিক শক্তির সংস্পর্শ এনে…

  • চাইতে থাকার গল্প

    আমি তো তোমাকে চাইতে থাকি। এদিকে সদ্য ঈষাণ দেয়া বাড়িটা দশতলা হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের জানালাগুলোতে আলো জ্বলে। কোনো এক তলার ছোট্ট বাচ্চাটা মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়।আমি তোমাকে চাইতে থাকি। বাচ্চাটা মায়ের হাত ছেড়ে একাই কোচিং যায়। বাড়ি ফিরে। তার বন্ধু হয়। সে আড্ডা দেয়।আমি তোমাকে চাইতে থাকি। বাচ্চাটাকে দেখিনা আর। এখন এক যুবক হেঁটে…

  • প্রবাদ

    সকালের চা খেতে খেতে বৃষ্টি দেখছিলাম। আমার চায়ের কর্নারে সাজানো আফ্রিকান ট্রাইবাল মাস্কগুলোর দিকে চোখ যেতেই হঠাৎ মনে পড়ল একটি আফ্রিকান প্রবাদ-“যে শিশুকে গ্রাম আগলে রাখে না, সে উষ্ণতা পেতে একদিন পুরো গ্রামই জ্বালিয়ে দেয়।” আমার এমন হয়।এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় প্রায়শই লাফিয়ে যাই। এই তো, এখনই মনে পড়ছে আরেকটি আফ্রিকান প্রবাদ-“জ্ঞান হচ্ছে বাবাব…