লায়লা মজনু

পারস্যের সপ্তম শতকের একজন কবি যার নাম কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ।
যার প্রেম কাহিনী পারস্যের লোককাহিনী হয়ে ঘুরে ফিরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।পরবর্তীতে নিজামী গঞ্জভী – রচিত এক মহাকাব্য এই কিংবদন্তিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে।

কী?-এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই চেনা যায়নি কায়েস ইবনে-আল মুলাওয়াহকে।কিন্তু জানেন কী,ইনি আমাদের খুব পরিচিত একজন!

খুলে বলছি।

লায়লা-মজনুর নাম জানেন না এমন কী কেউ আছেন? আমার তো মনে হয় নেই।

পারস্যের সপ্তম শতাব্দীর এক প্রেমিক কবি, কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ, যিনি পরবর্তীতে ইতিহাসে “মজনুন” নামে অমর হয়ে আছেন—উন্মাদপ্রেমিক, যার ভালোবাসার উপাখ্যান আরব্য মরু পেরিয়ে নানা ভাষার লোককাহিনীর শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়েছে।

আমরা যাকে মজনু হিসেবে চিনি।

কায়েস বিন মুলাওয়াহ ও লায়লা আল-আমিরিয়্যাহ ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বড় হয়েছেন, একসঙ্গে মাঠে চড়াতেন ভেড়া।

লায়লা ছিলেন কায়েসের চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। তারা খুব ছোট বয়সেই একে অপরকে ভালোবেসে ফেলে্ন, এবং সেই ভালোবাসা দিনে দিনে আরও গভীর হতে থাকে।

কায়েস তার ভালোবাসা নিয়ে কবিতা লেখা শুরু করেন, এবং তার কবিতায় বারবার লায়লার নাম উল্লেখ করতেন। এক সময় তিনি লায়লার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু লায়লার বাবা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ কায়েস ও লায়লার পরিবারে তখন পারস্পরিক বিরোধ চলছিল।

পরে লায়লার বিয়ে হয় তায়েফ অঞ্চলের তাকীফ গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত-ধনী-যুবক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। এই খবর শোনার পর কায়েস নিজ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পার্শ্ববর্তী মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। লায়লার প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই উন্মাদনাপূর্ণ ছিল যে, শহরের লোকজন তাকে “মজনুন” নামে ডাকতে শুরু করে, যার অর্থ উন্মাদ বা পাগল।

মজনুর পরিবার শেষে তার ফিরে আসার আশা ছেড়ে দেয় এবং মরুভূমিতে তার জন্য খাবার রেখে আসত। তাকে মাঝে মাঝে দেখা যেত, একা একা নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা লাঠি দিয়ে বালিতে কিছু লিখছে।

লায়লা উত্তর আরবের কোনো এক স্থানে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন, এবং সেখানে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন ও মৃত্যুবরণ করেন।

কিছু সংস্করণ অনুযায়ী, লায়লা বিচ্ছেদ সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

পরে মজনুকেও মৃত অবস্থায় মরুভূমিতে লায়লার কবরের পাশে পাওয়া যায়। তার পাশে একটি পাথরে তিনটি কবিতা খোদাই করা ছিল—এগুলোই তার শেষ কবিতা বলে মনে করা হয়।

মজনু লিখেন-

“I pass by these walls—the walls of Layla—
And I kiss this wall and that wall.
It’s not the love of the houses that has taken my heart,
But the love of the One who dwells in those houses.”

দ্য ফোরটি রুলস অফ লাভ বইতে একটা গল্প আছে এমন-

হারুন আল‑রশিদ, আব্বাসীয় খলিফা, যখন শুনলেন যে কায়েস নামে এক কবি যিনি “মজনুন”—অর্থাৎ পাগল—নামে পরিচিত এবং সে তার প্রিয় লায়লা-র প্রেমে পাগল হয়ে গেছে, তখন তার কৌতূহল জেগে ওঠে। তিনি ভাবলেন-“এই লায়লা নিশ্চয়ই অন্য সবার চেয়ে আলাদা কোনো নারী—অসাধারণ সৌন্দর্য ,অলৌকিক কেউ অথবা আশ্চর্য কোনো যাদু জানে”

তাই খলিফা অতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন লায়লার জন্য।তিনি উপায় খুঁজতে থাকলেন লায়লাকে দেখার,অবশেষে একদিন লায়লাকে প্রাসাদে ডেকে আনা হয়। লায়লা তার নেকাবে ঢাকা মুখ থেকে নেকাব খুলে ফেললেন।

হারুন যখন লায়লাকে চোখের সামনে দেখেলেন, মন ভেঙে গেল। রক্তমাংসের এক নারী-কোনো যাদুবিদ্যা জানা নন,না অত্যন্ত সুন্দর, না অপূর্ব,না অলৌকিক । তিনি একজন সাধারণ নারী,আর পাঁচটা মানুষের মতোই দেহ ও দুর্বলতা নিয়ে ভরা এক মানবী।

খলিফা হতবাক হয়ে বললেন,

“তুমি কি সেই লায়লা, যার জন্য মজনুন পাগল হয়েছেন? তুমি তো সাধারণ দেখতে—তোমার মধ্যে কী বিশেষ?”

লায়লা শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন-

“হ্যাঁ, আমি লায়লা। কিন্তু তুমি মজনু নও।
তোমাকে মজনু-এর চোখে আমাকে দেখতে হবে। না হলে তুমি কখনো বুঝতে পারবে না আমার মধ্যে কী বিশেষ। “

একবার মজনু এক কাফেলায় হঠাৎ করেই লায়লার এক ঝলক মাত্র দেখতে পান।তিনি দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে থাকেন কাফেলার পেছনে।

তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। তার পায়ের তলায় কী পড়ছে সেদিকে তার হুশ নেই।

সেই সময় এক ব্যক্তি নামাজ পড়ছিলেন মরুর বালির ওপর।স্থান-পাত্র -হুশহীন মজনু যথারীতি তাকে মাড়িয়ে ছুটলেন।

নামাজরত সেই ব্যক্তি অত্যন্ত চটে গেলেন।তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন মজনুর।ছুটতে ছুটতে দিন হেলে পড়তে শুরু করলো,মজনু কাফেলার দিশা হারালেন।

শ্রান্ত পায়ে ফিরতে থাকলেন।

অপেক্ষায় থাকা সেই ব্যক্তি মজনুকে পেয়ে -অত্যন্ত ভৎসনা করতে থাকলেন।বললেন আল্লাহ তাকে,কী কী শাস্তি দিতে পারেন তার বয়ান।

মজনু সব শুনলেন।

তারপর আলতো হেসে বললেন-লায়লা,এক সামান্য মানুষ মাত্র,কেবল তার এক ঝলকে -তার দিদার পাওয়ার আশায়,তার প্রেমে মশগুল আমি এমন ছুটেছি যে আমি লক্ষ্য করিনি কোথায় কী আছে!
আর তুমি মহান আল্লাহ,যিনি সমস্ত সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন-তার দিদার লাভের আশায় তার প্রেমে সেজদারত অবস্থায় টের পেয়েছো কে তোমার ঘাড় মাড়িয়ে গেলো!

Similar Posts