দুঃখের সাময়িক অনুপস্থিতি সুখ

সেদিন একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম ইউভাল নোয়া হারারির।তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যদি আপনি নিহিলিস্ট না হন,আপনি কি বিশ্বাস করেন জীবনের উদ্দেশ্য আছে?

হারারি অনেক শব্দে যে উত্তর দিলেন তার মর্ম দাঁড়ায়-জীবনের মানে দুঃখকে বোঝা এবং তা থেকে মুক্ত হওয়া।

তিনি আরও যা বলছিলেন তার অর্থ ,মানুষের প্রথম উপলব্ধি হওয়া উচিৎ দুঃখ অবশ্যম্ভাবী নয়,আপনি এ সম্পর্কে কিছু করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে মাত্র দুটি জিনিস সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণে-বর্তমান মুহূর্ত এবং নিজের মন।

পৃথিবীর যত কিছু আছে যা কিছু আয়োজন সমস্তই মানুষকে তার নিজস্ব বেদনা থেকে মুক্তি দিতে।কিন্তু নিজেকে উপলব্ধি করতে না পারলে তার সব’ই ব্যর্থ হয়।

মানুষ অনেক কিছুর জন্যই ছুটে-টাকা, প্রভাব, সৌন্দর্য, মর্যাদা। আমরা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় এসব চাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলো সবই দুঃখ এড়ানোর চেষ্টা।

মানুষ টাকা চায়,ক্ষমতা চায় আসলে নিজেকে আড়াল করবার জন্যই। যাতে অসুস্থতা, দুঃখ, মৃত্যু এড়াতে পারে। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় হাজার হাজার বছর ধরে সম্রাট, স্বৈরশাসক, ধনকুবের কেউই এতে মুক্তি পায়নি।তাদের অংশের দুঃখের ভাগ বইতে তাদের হয়েছেই হয়েছে।

দুঃখ নিয়ে এই আলাপ শুনতে শুনতে সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চিন্তার কথা মনে পড়লো।ওশো বলেছিলেন-

অন্যের দুঃখ মানুষকে অদ্ভুত আনন্দ দেয়।অন্যের সুখ পীড়া দেয়।
আপনি একটা চমৎকার বাড়ি বানালে আপনার গ্রামের সমস্ত লোকই আপনার ওপর মনে মনে নাখোশ হবে।
আপনি সুখে আছেন,সুস্থ আছেন কারোরই ভালোলাগবেনা।
আপনি আনন্দে বাঁচছেন,ঘুরে বেড়াচ্ছেন,আপনার বাড়িতে উৎসব হচ্ছে,গানের আসর বসছে-লোকে বলবে আপনি ভ্রষ্ট,ধর্মে মন নেই,আপনি নরকে যাবেন।
আপনি খেতে পাবেন না,আপনার ঘর পুড়ে যাবে,শরীর অসুস্থ হয়ে বিছানাগত,আপনার জন্য সমস্ত সহানুভূতি নিয়ে মানুষ হাহাকার করবে,সহানুভূতি দেখাবে।

অনেকক্ষেত্রেই ওশোর বলা কথাগুলো ঠিক।মানুষ অন্যের উপর দয়া দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করতেই ভালোবাসে।যার মাথার ওপর কাঠাল ভেঙে খাওয়া যায়,যার মাথার উপর ছড়ি ঘোরানো যায় তাকেই মানুষ পছন্দ করে।
পিড়িতের প্রতি সহানূভূতি আসলে নিজের ইগোকেই আরাম দেয়া।

Similar Posts

  • উৎপল কুমার বসুর একটা লাইন আছে- আমার আত্মার চেয়ে সহজ চাতুর্যময় তোমার চলে যাবার ভঙ্গি।আমি সেই লাইনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকি। দেখি ভাদ্রের মেঘে মেঘে বিদ্যাপতির-এ ভরা বাদর, মাহ ভাদরশূন্য মন্দির মোর। আমি দেখি আমার টানা বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে। ভাস্কর চক্রবর্তী বলছেন- যে বিকেলে জ্বর আসে তুমি তার মত করে দাঁড়িয়েছো। সরে এলে কিছু, দেখি…

  • হারাই হারাই সদা করি ভয়

    ঋতুপর্ণ ঘোষের আবহমান সিনেমার একটা দৃশ্য আছে যেখানে মমতাশংকর দিপংকরকে আক্ষেপ করে বলছেন-আমি তোমার নায়িকা হতে পারলাম না,প্রেমিকা তো হতে পারতাম।আমি সোজা তোমার বউ হয়ে গেলাম।দুজনে মিলে লুকিয়ে সিনেমা দেখলাম না,বাড়িতে মিথ্যে কথা বলে দীঘায় ঘুরতে গেলাম না।কেউ আপত্তি করলোনা,কেউ বারণ করলোনা! সহজে পাওয়া যায় এমন কিছুর প্রতি মানুষের সহজাত অবহেলা থাকে।অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান…

  • কবিতা যে কারণে

    শব্দের রাস্তা ধরে হাঁটতে গিয়ে,কবিরা যে হোঁচট খন তা’ই আসলে কবিতা। কবিতা সেই দুঃখবন,গাঢ় হয় রূপকে। আড়ালকে ভরসা করে যে কথাগুলো কবি বলেন সে কথাগুলো তেমনই থেকে যায়।পাঠকের কাছে যা পৌছায় তা পাঠকের নিজেরই কল্পনা অথবা অবচেতনের বিস্তার। কবিতা কোনও চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা বলেনা বরং সমূহ গন্তব্যের সম্ভাবনার কথা বলে । কবিতা বাস্তব নয় আবার…

  • শব্দের গতি

    ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার “কোলাহল” শব্দটা নিয়ে আক্ষেপ করে বলেছছিলেন শব্দটাকে আমরা এতো ভীতি দিয়ে মুড়ে দিয়েছি!বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যারা তাদের সহজ অর্থ হারিয়ে ,ভয়বোধক দ্যোতনার প্রতিফলন হয়ে গেছে। যেমন-ভিড়,একা,কোলাহল,নিঃসঙ্গতা,নিস্তব্ধতা,অন্ধকার এমন আরও বহু শব্দ! সক্রেটিস বলেছিলেন,ভাষার অপব্যবহার আত্মায় দানবের জন্ম দেয়।তিনি ব্যাকরণের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা বোঝাননি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন ভাষার সত্যকে অস্বীকার করে…

  • ভালোবাসা সে’তো ভালোবাসা

    হুমায়ূন আহমেদ সম্ভবত “নীল অপরাজিতা” বইটির কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন- “ভালবাসা সম্পর্কে আমার একটা থিওরি আছে। আমার মনে হয়, প্রকৃতি প্রথমে একটি নকশা তৈরি করে। অপূর্ব ডিজাইনের সেই নকশা হয় জটিল এবং ভয়াবহ রকমের সুন্দর। তারপর প্রকৃতি সেই ডিজাইনকে কেটে দু’ভাগ করে। একটি ভাগ দেয় এক তরুণ বা পুরুষকে, অন্যটি কোন তরুণী বা নারীকে। ছেলেটি…

  • রেইন রেইন গো এওয়ে

    তোমারে ব্যথায় রেখে আমি একাই হাঁটি। শহর দাঁড়ায় থাকে বৃষ্টি মাথায়। কোথাও হয়তো দূরেই বাচ্চারা চিৎকার করে রেইন রেইন গো এওয়ে! আমি কোথায় যাবো ভেবে তোমারে দুঃখ দেই। শহরের দুই একটা পুরুষ আমারে ধাক্কা মেরে চলে যায়। আমি দাঁড়ায় থাকি। বৃষ্টি মাথায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি জারুলের থোকা। জারুলের মতোন তুমিও কি এতোটা বেগুনী হও আমার…