অন্তরীন:সিনেমার ভাষায় নীরবতা

একটা উড়ো ফোনের ওপাশে এক নারী কন্ঠ খুব সহজাতভাবে জানতে চান-ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে? উত্তরে না বললে ফের বলে ওঠেন-
নাহ,বেশ মজাতো।এখানে হচ্ছে,হাওয়াও দিচ্ছে।
এবার এপাশ যখন প্রশ্ন করে আপনি কী চান?
ওপাশের কন্ঠটি উত্তর দেয় -আমি কথা বলতে চাই।

দৃশ্যটা মৃণাল সেনের অন্তরীণ সিনেমার।অন্তরীণ মানে আটকে থাকা,নিজের ভেতরে শৃঙ্খলিত হয়ে থাকা।

নিজেকে বলবার আকুলতা মানুষের অনেকটা তৃষ্ণার মত।মানুষ আন্দকে,ব্যথা,নিরেট কোনো অহেতুক কথাকে বলতে চেয়েছে কেবল।নিরীহ আবদারে কেউ তাকে শুনুক চেয়েছে কেবল।

মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেও দেখা যায়,তারচেয়ে হাজারগুণ শক্তিশালীরা টেকেনি কেবল তাদের “কথা” ছিলোনা বলেনা।মানুষ তার ধ্বনিযন্ত্র ব্যবহার করে প্রায় সত্তর হাজারের মত শব্দ তৈরী করতে পারে,যা আর কোনো প্রানী পারেনা।

তবু মানুষ ধুঁকতে থাকে কেবল কথা না বলতে পারার অনাহারে।দুটো কথা,নিজের মত করে,অগোছালো করে সে অন্য কাউকে শোনাতে চায় নিজের কথা।

সেই কথার ভেলা নিয়ে এগোয় মৃণাল সেনের অন্তরীনের গল্প।
এক উড়ো কল থেকে জন্ম নেয় অপেক্ষার।রোজ ফোন আসতে শুরু করে।যার কাছে ফোনটা তিনি এক তরুণ লেখক।তার এক বন্ধুর পুরনো, জরাজীর্ণ প্রাসাদে কিছুদিন একা থাকার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে তিনি নিরিবিলিতে নিজের লেখালেখি করতে পারেন। সেই নির্জন প্রাসাদে একদিন হঠাৎই টেলিফোন বেজে ওঠে। ফোনের অপর প্রান্তে থাকেন আবহাওয়ার খবর জানতে চাওয়া এক অপরিচিত নারী।

একাকিত্ব আর কোলাহলহীনতার খোঁজে লোকালয় ছেড়ে আসা এক যুবক ক্রমেই অন্যরকম এক কোলাহলে ডুবে যান।নতুন কোনো গল্পের সন্ধ্যানে এসে একটা ফোনের অপেক্ষায় তিনি নিজেই গল্প হয়ে উঠেছেন।

যে গল্পে শব্দের এক মিহি সাঁকো অচেনা দু’জন নর-নারীকে জুড়ে রাখে আলাপচারিতার নিমগ্ন করিডোরে।দু’পা দু’পা করে এগোতে এগোতে তারা ঢুকে পড়েন ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর কোনো যোগাযোগে।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে টেলিফোনেই এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারী নিজের নিঃসঙ্গতা, অসুখী দাম্পত্য এবং মানসিক একাকীত্বের কথা লেখকের সাথে ভাগ করে নেন। তারা একে অপরের নাম বা চেহারা না জেনেই মানসিকভাবে একে অপরের খুব কাছে চলে আসেন।

সিনেমার শেষে ট্রেনের কামরায় শেষ দৃশ্যে যখন তারা মুখোমুখি হয়,তখন নিশ্চিত হওয়া যায়না তারা একে অপরকে চিনতে পেরেছিলো কীনা।
কেবল থেকে যায় সুটকেস টেনে অচেনা স্টেশনে নেমে পড়া।আমি বহুবছর আগে এই সিনেমাটা দেখে একটা কবিতা লিখেছিলাম,যেখানে দুটো লাইন এমন-তুমি তাকিয়ে আছো,আমার যৌবন নেমপ্লেট পাল্টে হুবহু স্টেশনে নেমে যাচ্ছে বারবার।
সব সম্পর্কের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিণতি থাকে না,থাকে কেবল কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাস।

Similar Posts

  • চলে যাবে বলে….

    তবু নিঃশব্দে থেকে যাবার মত চলে যাচ্ছো তুমি।কোনো গাঢ় জ্যোস্নার পথ ধরে।আমার ভেতরে কেবল তোলপাড়। আর যে কোনো ফেরা নেই!আমি জানি। আমি জানি, এই প্রস্থান অনিবার্য।এ এক একমুখী যাত্রা,ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে দিয়ে তুমি প্রবেশ করছো এমন এক নীরবতায়-যেখানে স্মৃতিও আর পৌঁছাতে পারে না। আমার কোনো ভাষা নেই,যা দিয়ে ফেরানো যেতো তোমাকে।সমস্ত চলে যাবার…

  • অন্যমনস্ক পাতারা

    কোথাও যাবোনা, দুজন বসে থাকবো পাতাদের ঝরা শব্দেবিকেলের দিকে হেলে যাবো কিছুটামানুষের পায়ের কান্নায় যে পথ ভিজে ভিজে গেছে সারা দুপুরতার কাছে ,ফিরবো শুনশান নীরবতাকোথাও যাবোনা, শুধু বসে থাকবো দুজনেআরও অনেক দুজনার মধ্যে।

  • মানুষ ও তার ধারণা

    ইউভাল নোয়া হারারি’র “স্যাপিয়েন্স” এবং “হোমোদিউস” যারা পড়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই মানবজাতির বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে হিউম্যানকাইন্ড” হিসেবে বিবেচিত হবার যে যাত্রা সেই যাত্রার ধারণা পেয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তার বই “নেক্সাস”-এ এই হিউম্যাকাইন্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন এবং আশন্কা উঠে এসেছে। কিন্তু আমরা আমাদের অজান্তেই “হিউম্যানকাইন্ড” পেরিয়ে “ট্রান্সহিউম্যানিজম” প্রবেশ করে গেছি।…

  • হামারি আধুরি কাহানি

    মীর তকির সেই নজমটা আছেনা-উল্টি হো গয়ি সব তদবিরেঁ কুছ না দওয়া নে কাম কিয়াদেখা ইস বিমার-এ-দিল নে আখের কাম তামাম কিয়া।আমার ভাষায় যার মানে,সবই হলো বৃথা কোনো ওষুধে নিরাময় হলোনা আরদেখো,এই প্রেমাক্রান্ত হৃদয় শেষ করেই ছাড়ল! পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে প্রেম।প্রেমের চেয়ে ধাধাময় বোধ মানুষের আর কিছু নেই। মানুষ ভালোবাসে,কেউ হারিয়ে পায়,কেউ পেয়ে…

  • হেরে গিয়ে জিতে যাবার চেয়ে বড় জিতে যাওয়া হয়না

    এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হার হচ্ছে ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়া।কেউ আপনাকে এতোটা ভালোবাসছে যে ভালোবাসা আপনি তাকে কখনও বাসতে পারবেন না,এই হারের চেয়ে সুন্দর হার আর নেই। পৃথিবীর সমস্ত অভিধানে ‘হার’ শব্দটির অর্থ পরাজয় বা ব্যর্থতা হলেও কেবল প্রেমের অভিধানে এর অর্থ জিতে যাওয়া।এর অর্থ সাফল্য।একটু ভালোবাসার বদলে অঢেল ভালোবাসা ফিরে আসার মত বিজয়। ভালোবাসা…

  • হারাই হারাই সদা করি ভয়

    ঋতুপর্ণ ঘোষের আবহমান সিনেমার একটা দৃশ্য আছে যেখানে মমতাশংকর দিপংকরকে আক্ষেপ করে বলছেন-আমি তোমার নায়িকা হতে পারলাম না,প্রেমিকা তো হতে পারতাম।আমি সোজা তোমার বউ হয়ে গেলাম।দুজনে মিলে লুকিয়ে সিনেমা দেখলাম না,বাড়িতে মিথ্যে কথা বলে দীঘায় ঘুরতে গেলাম না।কেউ আপত্তি করলোনা,কেউ বারণ করলোনা! সহজে পাওয়া যায় এমন কিছুর প্রতি মানুষের সহজাত অবহেলা থাকে।অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান…