a man walking down a road at sunset

মানুষ

মন সরে গেলে স্মৃতি থেকে যায়। সেখানে সাঁতার কাটে চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস। সময়ের জালে নিজেকে জড়াতে জড়াতে আরও অস্ফুট হয়ে ওঠে মানুষ। মানুষই মানুষকে ছেড়ে যায়। আবার মানুষই অপেক্ষা করে দরোজা খুলে। যে মানুষটা ছেড়ে গেলো তার উপর বিশ্বাস হারিয়ে আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে মানুষ। রাস্তার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে আবারও নতুন করে চাইতে শেখে। আর এই বহমানতাই তো জীবন।

বাড়ি – শব্দটা উচ্চারণ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইট, কাঠ, পাথরের ইমারত। এগুলোই নাকি মানুষের বাড়ি! অথচ প্রিয় কোনও মানুষকে আমার বাড়ি মনে হয়। মনে হয় মানুষের ভেতরেই মানুষের বাড়ি।মানুষের বুকই মানুষের আশ্চর্য জাদুঘর!

মানুষহীন ঘরগুলোকে রাক্ষসের মতো মনে হয়। মনে হয় সেই ঘরগুলো মুখিয়ে থাকে মানুষকে গিলে নিতে। একা ঘরগুলোতে মানুষ কি করে থাকে? যেখানে ডাকগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। যেখা‌নে কেউ অপেক্ষা করেনা অধীর হয়ে।যেখানে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেবার কেউ নেই। আবার সেই ঘরগুলো যেগুলোতে মানুষতো আছে, কিন্তু ডাকবার কেউ নেই।তারা পাশের ঘরে থেকেও সাত সমুদ্দুর তেরো নদী। সেখানকার থেকে কবর অথবা চিতা কি খুব আলাদা?পৃথিবীতে যাদের জন্য কোথাও কেউ অপেক্ষা করেনা তাদের জীবন তো মৃত গাছ। তাদের পাতাহীন বেঁচে থাকার কাছে বিলাপ করে আত্মা। ভয় হয় মানুষের এই মানুষহীনতা। মানুষ ছাড়া অপেক্ষা, প্রেম, যত্নের অনুভূতিগুলো তো আর কোথাও মেলে না।

আজকাল আমরা ভিষণ আধুনিক। আমাদের সিনেমা আছে, বই আছে, ঘুরতে যাওয়া আছে, ফোন আছে। এই এতো আছেতে আমরা মানুষ থাকার ব্যাপারটা বোধহয় ভুলে যাচ্ছি। মানুষের থাকা না থাকা আর তেমন পার্থক্য রাখছিনা। ইচ্ছে হলে আসছি, ছেড়ে যাচ্ছি। খামখেয়ালে মানুষহীন হচ্ছি। অথচ মানুষ জরুরী। একটা বইয়ের শেষে, একটা সিনেমার শেষে, একটা গানের শেষে, দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে, জাগতিক সকল লেনদেন শেষে একটা মানুষ জরুরী। খুব জরুরী।

মানুষ! হ্যাঁ মানুষ।ইদানীং মানুষ মানুষ করি। জানি মানুষের নিরাময় শুধু মানুষই। একটা নদীর সৌন্দর্য যতোটা দূর বয়ে নিয়ে যায় তার চেয়ে গভীরে আমাকে টেনে নেয় মানুষ। আমি মানুষের মুহুর্তে ডুবে করি পৃথিবীর অনুবাদ। মানুষের ক্ষুধা, অসুখ, প্রেম, হিংস্রতা, যৌনতা কতো মুদ্রায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাকে চেনায় এই পৃথিবীকে! কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছিলেন “বেঁচে থাকতে মানুষ নিয়মিত যে ট্যাক্স দেয় তার নাম নিঃসঙ্গতা “। আমার নিঃসঙ্গতায় দারুণ ভয়। আমি নিঃসঙ্গ হলেই আমার ভেতরকার দানবটা জেগে ওঠে। তার সেই পরাক্রমশালী শক্তিতে দুর্বিষহ যে যাপন আমি সেই যাপন ভয় পাই। আর তাই খুব করেই চাই ঘিরে থাক আমাকে মানুষ। মানুষ থাকলেই অপেক্ষা থাকে। মানুষ থাকলেই প্রেম থাকে। প্রেম থাকলেই ভেতরের দানবটা ঘুমিয়ে থাকে। শত অশান্তিও শান্ত লাগে।

যদিও জানি মানুষের মাঝেও মানুষ আসলে শূন্য আর নিঃসঙ্গ। মানুষের শূন্যতাকেন্দ্রীক এই আবর্তন কোনও অস্তিত্বই শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনা। মানুষ অমোঘ নিয়তির মতোই শূন্য আর নিঃসঙ্গ থেকে যায়। তবুও আমি শূন্য, আমি নিঃসঙ্গ এইটুকু বলবার জন্যও মানুষের মানুষ থাক।

Similar Posts

  • মৃত প্রেমিকের আখ্যান

    তুমি জানতে বেঁচে থাকাটা আমার কতোপ্রিয়,তাই তোমাকে হারােনার দুঃখ অর্থবহকরে তুলতে আমি ঢুকে পড়ি শহরেরযেকােনো পানশালায়।সমস্ত আবেগকে অ্যালকোহলে ডুবিয়েজুয়ার টেবিলে কয়েক দান হেরেউদযাপন করে নিই ভােলােবেসে নিঃস্বহবার শোক।অতঃপর বাড়ি ফিরে স্লিপীং পিলেরঅধীনে ঘুমকে সমর্পিত করে মাথা রাখিপোষা বালিশে।সকালে ঘুম ভাঙার পর রোজ ভাবিএবার তোমাকে এও জানাতে হবেনিজের মৃত দেহকে সামলেবেঁচে থাকাটা নেহাৎ অপ্রিয় নয়!

  • শিরি – ফরহাদ

    ছোটবেলায় শিরি-ফরহাদের অলৌকিক প্রেমের গল্প শুনতাম।শিরির গায়ে আঘাত করলে নাকি ফরহাদের শরীরে সেই আঘাত ভেসে উঠতো। গতকাল থেকে প্রচন্ড জ্বর।আমি জানতাম ঠিক আমার সহ-জনও অসুস্থ হবেন।আমি অসুস্থ হলে নির্ঝরেরও আর শরীর চলেনা।এই যুগের শিরি-ফরহাদ! শিরিন ছিলেন এক আরমেনীয় রাজকুমারী।সৌন্দর্যে অপূর্ব, গুণে অতুলনীয়। তার রূপের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। পারস্যের রাজপুত্র খসরু (বা খসরু পারভেজ) তার…

  • ঘুমহীনতার শহর ও স্মৃতির বিস্মৃতি: মাকোন্দো থেকে নিউরোসায়েন্স

    গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস “নিঃসঙ্গতার একশ বছর”-এর শহর মাকোন্দো।পুরো মাকোন্দোবাসীর এক আজব রোগে আক্রান্ত হলো,অনিদ্রা।  মাকোন্দো শহরে বুয়েন্দিয়া পরিবারে হাজির হয় একটি ছোট্ট মেয়ে রেবেকা, যার বাবা-মার কথা এই পরিবারের কেউ মনে করতে পারে না। এই বহিরাগত, অপরিচিত রেবেকাই প্রথম আক্রান্ত হয় অনিদ্রায়। সবার আগে তা বুঝতে পারে বাড়ির পরিচারিকা আদিবাসী বিসিতাসিয়োন এবং সবাইকে সে…

  • প্রবাদ

    সকালের চা খেতে খেতে বৃষ্টি দেখছিলাম। আমার চায়ের কর্নারে সাজানো আফ্রিকান ট্রাইবাল মাস্কগুলোর দিকে চোখ যেতেই হঠাৎ মনে পড়ল একটি আফ্রিকান প্রবাদ-“যে শিশুকে গ্রাম আগলে রাখে না, সে উষ্ণতা পেতে একদিন পুরো গ্রামই জ্বালিয়ে দেয়।” আমার এমন হয়।এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় প্রায়শই লাফিয়ে যাই। এই তো, এখনই মনে পড়ছে আরেকটি আফ্রিকান প্রবাদ-“জ্ঞান হচ্ছে বাবাব…

  • রোম এবং এগ্রোপিনা

    সিংহাসনে অধিষ্ঠান বরাবর রক্তের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে।রক্তের স্রোত কেবল মুখ বদলে দেয়। এমনই এক জুলাই আঠারোর রাতে অগ্নুৎপাত হয় রোমের সার্কাস ম্যাক্সিমাসের পাশের এক দোকানঘর থেকে। প্রায় ছয় দিন ধরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা নগরীতে। তখনকার রোম ছিল কাঠ আর পিচের পাতা দিয়ে তৈরি ঘর-বাড়িতে ঠাসা—তাই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।তৎকালীন রোমের সম্রাট ছিলেন নীরো।যার পুরো…

  • নয় জীবন

    উইলিয়াম ডালরিম্পলের “নাইন লাইভস” -নয় জীবনের গল্প। প্রতিটি অধ্যায়ে একজন করে চরিত্র তার নিজের গল্প বলেছেন।এরা কাল্পনিক নয় রক্তে মাংসে বাস করা জীবন্ত মানুষ। সাক্ষাৎকার বলা হলেও আসলে আত্মকথনের ভঙ্গিমায়,তাদের ভাষ্যেই লিখেছেন ডালরিম্পল।তারা কেউ জৈন সন্ন্যাসী , কেউ সুফি দরবেশ ,কেউ তন্ত্রসাধক, কেউ বা তিব্বতি ভিক্ষু ।এই মানুষদের জীবনে ধর্ম কেবল বিশ্বাস নয়, আশ্রয়, অস্তিত্ব,…