রোম এবং এগ্রোপিনা

সিংহাসনে অধিষ্ঠান বরাবর রক্তের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে।রক্তের স্রোত কেবল মুখ বদলে দেয়।

এমনই এক জুলাই আঠারোর রাতে অগ্নুৎপাত হয় রোমের সার্কাস ম্যাক্সিমাসের পাশের এক দোকানঘর থেকে। প্রায় ছয় দিন ধরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা নগরীতে। তখনকার রোম ছিল কাঠ আর পিচের পাতা দিয়ে তৈরি ঘর-বাড়িতে ঠাসা—তাই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তৎকালীন রোমের সম্রাট ছিলেন নীরো।যার পুরো নাম লুসিয়াস ডোমিটিয়াস অ্যাহেনোবারবুস।

বহু ইতিহাসবিদদের মতে এই আগুন লাগিয়েছিলেন নীরো নিজেই। তার স্বর্ণপ্রাসাদ তৈরির জন্য।যার নাম ডমাস অরিয়া।
তারা এটাও বলেন, রোম যখন পুড়ছিলো তিনি তার বারান্দায় বসে বেহালা বা বাঁশির মতো কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই কাহিনিই জন্ম দেয় ঐতিহাসিক প্রবাদ বাক্যটির:

“রোম যখন পুড়ছিলো নীরো তখ বাঁশি বাজাচ্ছিল”

অনেক ইতিহাসবিদ আবার মনে করে সেই ঘটনার সময় নীরো রোমেই ছিলেন না।

তবে আমার আগ্রহের জায়গা নীরো নন।তার মা এগ্রিপিনা দ্য ইয়াঙ্গার।যাকে ইতিহাসবিদরা সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবিদ দাবি করেন।

যাকে হত্যা করেছিলেন খোদ নীরো নিজেই।একজন মানুষ কতোটা প্রভাব এবং প্রতাপ বিস্তারকারী হলে তার নিজ সন্তান হয়ে ওঠেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী। হন্তারক।এ তো সহজেই অনুমেয়।

প্রথম শতাব্দীর রোমান সাম্রাজ্য ছিল ক্ষমতার সংঘর্ষে পূর্ণ এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে রাজনীতি মানে ছিল হত্যা, ষড়যন্ত্র আর নির্মমতা। এই সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক নারী—এগ্রিপিনা দ্য ইয়াঙ্গার।যিনি ছিলেন কেবল রোমের প্রথম প্রকৃত সম্রাজ্ঞীই নন,বরং পুরুষশাসিত জুলিও-ক্লডিয়ান রাজবংশের পরাক্রম এক শক্তির নাম।

এগ্রিপিনা জন্মগ্রহণ করেন এক অভিজাত রক্তধারায়। তিনি ছিলেন সম্রাট অগাস্টাসের নাতনি, এবং ভবিষ্যৎ সম্রাট ক্যালিগুলার বোন। খুব অল্প বয়সে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে, তিনি তার চাচাতো ভাই ডোমিটিয়াস-কে বিয়ে করেন এবং এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন,যে পরে ইতিহাসে নীরো নামে পরিচিত হয়।

টাইবেরিয়াসের মৃত্যুর পর এগ্রিপিনার ভাই ক্যালিগুলা সম্রাট হন এবং তার বোনদের (ড্রুসিলা, আগ্রিপিনা, লিভিল্লা) সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্মান দেন। কিন্তু এই সৌহার্দ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। এক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে এগ্রিপিনাকে তিনি নির্বাসনে পাঠান।

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় টাইবেরিয়াসের মত ক্যালিগুলাকেও হত্যা করা হয়।
ক্যালিগুলা হত্যার পর, তার চাচা ক্লডিয়াস সম্রাট হন এবং এগ্রিপিনাকে রোমে ফিরিয়ে আনেন। এ সময় এগ্রিপিনা কেবল এক দুঃখিনী রাজকন্যা নন, বরং এক সুপরিকল্পিত রাজনীতিক এবং তুখোড় কুটনীতিবিদ হয়ে ফিরে আসেন।

এরপর এগ্রিপিনা এক দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক কৌশল রচনা করেন—প্রথমে ক্লডিয়াসকে বিয়ে করেন, পরে তাকে রাজি করান নীরোকে দত্তক নিতে ও উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতে।
ক্লডিয়াসকে বিয়ে করেন এবং পুত্র নীরোকে ক্লডিয়াসের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় সফল হন।

ক্লাউডিয়াসের স্ত্রী হওয়ার পর তার আচরণই তাকে অনন্য করে তোলে। আগের বা পরবর্তী সম্রাটদের স্ত্রীরা শুধুমাত্র স্বামীর রাজত্বে প্রভাবশালী ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত কোনো অব্দান বা প্রভাব তাদের ছিলোনা।কিন্তু এগ্রিপিনা ছিলেন ভিন্ন।

তার প্রথম কাজ ছিল নিজের জন্মস্থান জার্মানিতে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করা, যা তার নামানুসারে ‘কলোনিয়া ক্লডিয়া এগ্রিপিনেনসিয়াম’ নামে পরিচিত ছিল, যা পরে ‘কলোন (Colonge)নামে পরিচিতি পায়। তিনি স্বর্ণ পরতেন ও বেগুনি রঙের পোশাক পরিধান করতেন — যা শুধুমাত্র সম্রাটদের জন্য সংরক্ষিত ছিল — এবং স্বামীর পাশে রোমান সাম্রাজ্যের পতাকাগুলোর সামনে বসতেন। তিনি প্রকাশ্য নিজেকে তুলে ধরায় পুরুষ রোমানদের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করেছিলেন এবং পুরুষদের বাধ্য করেছিলেন যে একজন নারী তাদের ওপর শাসন করছে তা মেনে নিতে। এমনকি তিনি তাঁর আত্মজীবনী লিখেছিলেন, যা কোনো রোমান নারী তার আগে কখনো করেননি।

পরবর্তীতে তিনি ক্লডিয়াসকে বিষমিশ্রিত মাশরুম খাইয়ে হত্যা করেন। তার ১৬ বছরের পুত্র নীরোকে সম্রাট করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো নারী, যিনি প্রথম একজন সম্রাট বানানোর ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে সফল হন,নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন।

নীরোর প্রথম শাসনকালজুড়ে এগ্রিপিনা ক্ষমতার সহাসনে ছিলেন। মুদ্রা ও ভাস্কর্যে তাদের মুখাবয়ব সমান গুরুত্বে খোদাই করা হয়। এক ভাস্কর্যে দেখা যায়, তিনি নীরোকে রাজমুকুট পরাচ্ছেন—যেন তিনি রাজত্বের জননী।

রোমে তার জনপ্রিয়তা ছিল প্রবল, প্রশাসনিক দক্ষতায় ছিলেন প্রশংসিত। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্যে এক দশক শান্তি বিরাজ করে।

কিন্তু ক্ষমতার ভাগাভাগি চিরকাল টেকে না। নীরো ধীরে ধীরে মায়ের প্রতিপত্তিকে ভয় পেতে শুরু করেন। তার ব্যক্তিগত জীবনেও আগ্রিপিনা হস্তক্ষেপ করতে থাকেন। বিশেষত নীরোর প্রেমিকা পোপিয়া সাবিনাকে ঘিরে শুরু হয় মায়ের সঙ্গে সংঘর্ষ।

শেষমেশ, নীরো চক্রান্ত করে। এক দুর্ঘটনার ছক কষেন— যেখানে একটি কৌশলগতভাবে নির্মিত নৌকা বানানো হয় যা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে ডুবে যাবে, এগ্রিপিনাকে নিয়ে।

কিন্তু নীরো সম্ভবত জানত না এগ্রিপিনা ভালো সাঁতার জানেন। তিনি ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে বেঁচে যান, এমনকি সীসার ছাদ তার ওপর ভেঙে পড়ে হাত ভেঙে যাওয়া সত্ত্বেও- আহত অবস্থায় তিনি তীরে পৌঁছান। এই সংবাদ শুনে নীরো আতঙ্কিত বোধ করেন।

তখন নীরো সেনা পাঠিয়ে তার মাকে নিজের ঘরে হত্যা করান।

এই হত্যাকাণ্ডের পর নীরোর জনপ্রিয়তা দ্রুত অবনতি ঘটে, এবং তার শাসন আর কখনো স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি।

এগ্রিপিনার মৃত্যু ছিল রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার প্রতীক। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়া, একটি বেনামা কবরে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর।

তবে ইতিহাস তাকে মনে রাখে ভিন্ন কারণে—তিনি ছিলেন এমন এক নারী যিনি পুরুষদের রাজনীতিতে জাঁকিয়ে বসেছিলেন, রাষ্ট্র চালিয়েছিলেন, সন্তানকে সম্রাট বানিয়েছিলেন, আবার তাকেই শত্রুতে পরিণত করেছিলেন।

রোমের ইতিহাসে,এগ্রিপিনা দ্য ইয়াঙ্গারই ছিলেন সেই প্রথম নারী যিনি কেবল পর্দার আড়াল নয়, সামনে দাঁড়িয়ে রাজনীতি বদলে দিয়েছিলেন।

(পুনশ্চ: নীরোর তার মাকে হত্যা চেষ্টাকে চিত্রিত করা হয়েছে অত্যন্ত নাটকীয় ও শৈল্পিকভাবে গ্যুস্তাভ ভার্থহাইমার-এর আঁকা চিত্রকর্ম “এগ্রিপিনার জাহাজডুবি”-তে।)

Similar Posts

  • শিরি – ফরহাদ

    ছোটবেলায় শিরি-ফরহাদের অলৌকিক প্রেমের গল্প শুনতাম।শিরির গায়ে আঘাত করলে নাকি ফরহাদের শরীরে সেই আঘাত ভেসে উঠতো। গতকাল থেকে প্রচন্ড জ্বর।আমি জানতাম ঠিক আমার সহ-জনও অসুস্থ হবেন।আমি অসুস্থ হলে নির্ঝরেরও আর শরীর চলেনা।এই যুগের শিরি-ফরহাদ! শিরিন ছিলেন এক আরমেনীয় রাজকুমারী।সৌন্দর্যে অপূর্ব, গুণে অতুলনীয়। তার রূপের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। পারস্যের রাজপুত্র খসরু (বা খসরু পারভেজ) তার…

  • আত্মজাগরণের নির্জন করিডোর”

    “আমি একা” এই বাক্যটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে  এক ধরনের দুঃখ, অসহায়ত্ব বা বিচ্ছিন্নতার অনুভব জেগে ওঠে। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, একা থাকা মানেই যেন অপূর্ণতা। যেন জীবনের সার্থকতা কেবল সম্পর্ক, সংযোগ, ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভেতরেই নিহিত।  মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী।বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষ বাস করে জোটবদ্ধ এক সামাজিক পরিস্থিতিতে।যার অকেকখানিই নির্ভর করে থাকে চাহিদা,নিরাপত্তা,প্রত্যাশার উপর।…

  • আকাশ সমাধি

    মৃত্যু হলে মৃতের সৎকার করা হয়।বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্নরকম রীতি।আমি ভাবতাম আচার যত ভিন্নই হোক মৃতকে কেবল মাটিতে সমাধি দেয়া হয় বা দাহ করা হয়।কিন্তু আকাশ সমাধির কথা শুনেছেন? জরুথ্রস্ত ধর্মে (যা আজও ইরান ও ভারতীয় পারসি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত), মৃতদেহকে “অশুচি” বা নাসু হিসেবে গণ্য করা হয়।বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যু একটি দানবিক শক্তির সংস্পর্শ এনে…

  • নয় জীবন

    উইলিয়াম ডালরিম্পলের “নাইন লাইভস” -নয় জীবনের গল্প। প্রতিটি অধ্যায়ে একজন করে চরিত্র তার নিজের গল্প বলেছেন।এরা কাল্পনিক নয় রক্তে মাংসে বাস করা জীবন্ত মানুষ। সাক্ষাৎকার বলা হলেও আসলে আত্মকথনের ভঙ্গিমায়,তাদের ভাষ্যেই লিখেছেন ডালরিম্পল।তারা কেউ জৈন সন্ন্যাসী , কেউ সুফি দরবেশ ,কেউ তন্ত্রসাধক, কেউ বা তিব্বতি ভিক্ষু ।এই মানুষদের জীবনে ধর্ম কেবল বিশ্বাস নয়, আশ্রয়, অস্তিত্ব,…

  • মৃত প্রেমিকের আখ্যান

    তুমি জানতে বেঁচে থাকাটা আমার কতোপ্রিয়,তাই তোমাকে হারােনার দুঃখ অর্থবহকরে তুলতে আমি ঢুকে পড়ি শহরেরযেকােনো পানশালায়।সমস্ত আবেগকে অ্যালকোহলে ডুবিয়েজুয়ার টেবিলে কয়েক দান হেরেউদযাপন করে নিই ভােলােবেসে নিঃস্বহবার শোক।অতঃপর বাড়ি ফিরে স্লিপীং পিলেরঅধীনে ঘুমকে সমর্পিত করে মাথা রাখিপোষা বালিশে।সকালে ঘুম ভাঙার পর রোজ ভাবিএবার তোমাকে এও জানাতে হবেনিজের মৃত দেহকে সামলেবেঁচে থাকাটা নেহাৎ অপ্রিয় নয়!

  • হরপ্পা অজানা লিপি

    আমার হাতে ফলকটি হরপ্পা লিপির।মিশর সভ্যতার হায়ারোগ্লিফিক্স,সুমেরীয় সভ্যতার কিউনিফর্ম পাঠোদ্ধার সম্ভব হলেও এই হরপ্পা লিপির পাঠোদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি। আমার কাজে সাহায্যকারী বুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আপা এই গরুর দরবেশের লাখান দাড়ি কেন! আমি হেসে জবাব দিলাম-কত রথি মহারথিরা এই কেনোর উত্তর জানেন না।আমি আর কোন ছাড়! অন্যান্য সভ্যতা যেমন-মিশর সভ্যতা,সুমেরীয় সভ্যতা কিংবা চীনা সভ্যতায়…