ঘুমহীনতার শহর ও স্মৃতির বিস্মৃতি: মাকোন্দো থেকে নিউরোসায়েন্স

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস “নিঃসঙ্গতার একশ বছর”-এর শহর মাকোন্দো।পুরো মাকোন্দোবাসীর এক আজব রোগে আক্রান্ত হলো,অনিদ্রা। 

মাকোন্দো শহরে বুয়েন্দিয়া পরিবারে হাজির হয় একটি ছোট্ট মেয়ে রেবেকা, যার বাবা-মার কথা এই পরিবারের কেউ মনে করতে পারে না। এই বহিরাগত, অপরিচিত রেবেকাই প্রথম আক্রান্ত হয় অনিদ্রায়। সবার আগে তা বুঝতে পারে বাড়ির পরিচারিকা আদিবাসী বিসিতাসিয়োন এবং সবাইকে সে সতর্ক করে দেয়। বলে যে এই মহামারির ভয়ঙ্কর দিক কিন্তু ঘুমোতে না পারা নয়, বরং স্মৃতির অবলুপ্তি।

শুরুতে কেউ তার কথায় আমল দেয় না। পরিবারের প্রধান হোসে আর্কাদিয়ো বুয়েন্দিয়া এ সব নেহাতই আদিবাসীদের কুসংস্কার ভেবে হেসে উড়িয়ে দেন। বলেন, না ঘুমোলে জীবনে অনেকটা বেশি সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু বেশ কিছু সপ্তাহ পরে আবিষ্কার করেন যে তারা সকলেই সংক্রমিত। বিগত পঞ্চাশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কেউ ঘুমোতে পারেনি। তাদের বাড়িতে তৈরি ক্যান্ডি বিক্রি হত বাজারে। ফলত পুরো শহর সংক্রমিত হয়ে গেল খুব দ্রুত।

পুরো এক শহর মানুষ-তারা ঘুমায়না,জেগে থাকে।রাতের পর রাত।ফলশ্রুতিতে এল সেই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি— বিস্মৃতি।

বিসিতাসিয়োন সে কথা আগেই বলে দিয়েছিল। যখন সংক্রমিত ব্যক্তিটি জেগে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করবে তার ছেলেবেলার স্মৃতি, তার পর ভুলে যাবে জিনিসপত্রের নাম ও তার উদ্দেশ্য, সব শেষে ভুলে যাবে অন্যদের পরিচয়, এমনকি আত্মপরিচয়ও। আর তখন এমন এক জড়বুদ্ধি অবস্থায় পরিণত হবে যার আর কোনও অতীত থাকবে না। অতীত নেই, অর্থাৎ স্মৃতির অভিজ্ঞতা নেই। 

তারা সব লিখে রাখতে শুরু করে পাথরে,দেয়ালে,এখানে- সেখানে।পুরো শহর হয়ে ওঠে পোস্টারের শহর।

বোর্হেস বলেছিলেন-  আমরা হচ্ছি আমাদের স্মৃতির সমষ্টি। আর বিজ্ঞান বলছে-স্মৃতি আগলে রাখতে প্রয়োজন ঘুম।

ইনসোমোনিয়া-নামটা শুনতে যতোটা রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়।ইন্সোমোনিয়াক হওয়াটা নিঃসন্দেহে ততোটা রোমান্টিক নয়।

একজন মানুষ একটনানা না ঘুমিয়ে সাত দিনের বেশী থাকলে তার মৃত্যু অনিবার্য। 

“গিলগামেশ মহাকাব্যে “গিলগামেশ যখন উতনাপিশতিমের কাছে অমরত্ব চাইতে গিয়েছিলেন,তখন উতনাপিশতিম তাকে ছয় রাত ,ছয় দিন না ঘুমিয়ে কাটানোর জন্য বলেছিলেন।

বলেছিলেন-অমরত্ব মানুষের জন্য নয়,দেবতাদের জন্য।তবুও ছয় রাত,ছয় দিন না ঘুমিয়ে পার করতে পারলেই আপনি লাভ করবেন অমরত্ব। 

গিলগামেশ পারেননি।মানুষের পক্ষে সম্ভবও নয়।

মানুষের জীবনে ঘুমের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, কারণ এটি আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। দেহের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে স্মৃতি সুসংহত করা ও মনে রাখার সক্ষমতা দৃঢ় করার কাজ—সবকিছুতেই ঘুম অপরিহার্য।

মানুষসহ পৃথিবীর সব প্রজাতিই এমন এক গ্রহে টিকে থাকার ও বিকশিত হওয়ার জন্য বিবর্তিত হয়েছে, যেখানে দিন ও রাতের ২৪ ঘণ্টার চক্র বিদ্যমান। ঘুম-সম্পর্কিত  কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী, রাতের বেলা একটানা ঘুম প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের একসাথে শিকারিদের হাত থেকে বাঁচাতে, শক্তি সংরক্ষণ করতে এবং বিশ্রামের প্রয়োজন পূরণ করতে সাহায্য করত। একইসাথে, এতে তাদেরকে দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার—এই দুই ভিন্ন পরিবেশে আলাদা করে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতো না।

মানুষের দেহে এমন কিছু জৈবিক ছন্দ কাজ করে যা এই ২৪ ঘণ্টার দিন-রাত্রির চক্র অনুযায়ী জীবনযাপন করতে সাহায্য করে; একে বলে সার্কেডিয়ান ছন্দ। এই ছন্দ আমাদের ঘুমের তাগিদ বা স্লিপ ড্রাইভ-এর সঙ্গে একত্রে কাজ করে।এই তাগিদ যত বেশি সময় ধরে আমরা জেগে থাকি, তত বেশি প্রবল হয়ে ওঠে, এবং রাতের দিকে আমাদের ঘুম পায়, সকালে জেগে ওঠার প্রবণতা তৈরি হয়।

এই সার্কাডিয়ান ছন্দ, যার মধ্যে ঘুম-জাগরণ চক্রও অন্তর্ভুক্ত, পরিবেশগত সংকেতের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। সন্ধ্যার পর যখন অন্ধকার নামতে শুরু করে, তখন শরীর স্বাভাবিকভাবেই ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

আমাদের ঘুমের কাঠামো—অর্থাৎ ঘুমের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে শরীর যেভাবে পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হয়—আমাদের ঘুম চলাকালীন যেসব প্রক্রিয়া ঘটে, যেমন শারীরিক নিরাময় ও কোনো কিছু শেখার প্রক্রিয়া, তা সম্ভব করে তোলে। এই ঘুমের স্তরগুলো সাধারণত চারটি ধাপে বিভক্ত:

প্রথম স্তর-

এটি ঘুমের সবচেয়ে হালকা স্তর, যা সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়।

দ্বিতীয় স্তর-

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা রাতের প্রায় অর্ধেক সময় এই স্তরে কাটান। এই সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ধীর হয়ে আসে, তবে মাঝে মাঝে কিছু দ্রুত তরঙ্গ তৈরি হয় যা মনে রাখার ক্ষমতা ও শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।

তৃতীয় স্তর-

এটিকে “স্লো ওয়েভ স্লিপ” বা “গভীর ঘুম” বলা হয়, যা ঘুম থেকে উঠে সতেজ বোধ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই স্তরে রক্তচাপ কমে, হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়, এবং শরীর গ্রোথ হরমোন নিঃসরণ করে। সাধারণত মানুষ রাতে ১০% থেকে ২০% সময় এই স্তরে থাকে।

REM Sleep (Rapid Eye Movement)-

এই স্তরে মানুষের চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে। REM স্তরেই সাধারণত স্বপ্ন দেখে মানুষ।সেই স্বপ্ন জীবন্ত ও স্পষ্ট স্বপ্ন  যায় এই স্তরে এবং তা স্মৃতিতে থেকেও যায়, এবং দেহের পেশী  সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায় যাতে কেউ স্বপ্নে দেখা কাজগুলো বাস্তবে না করে ফেলে। মেমরি কনসোলিডেশন বা স্মৃতি সংরক্ষণের প্রধান কাজ এখানেই ঘটে। এটি সাধারণত রাতে ঘুমের ২০% থেকে ২৫% সময়জুড়ে ঘটে, এবং ভোরের দিকে এর পরিমাণ বেশি হয়।

সুস্থ একজন ব্যক্তি রাতে ঘুমের এই চারটি স্তরের মধ্য দিয়ে বহুবার চক্রাকারে অগ্রসর হন। কিন্তু নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত অথবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের গঠনকে ব্যাহতকারী রোগ থাকলে এই চক্রের উপর প্রভাব পড়ে।যা  তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরে পপৌঁছাতে দেয়না।এবং এই অবস্থা থেকেই অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।শরীর ও মনের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

মানুষ তার জীবনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটায়।মানুষের ঘুমের স্তর,সার্কেডিয়ান রিদম ইত্যাদি জানা গেলেও- এখনও উত্তরহীন থেকে গেছে একটা প্রশন-“মানুষ কেনো ঘুমায়?”

ম্যাথিউ ওয়াকার, একজন খ্যাতনামা নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং ঘুমবিজ্ঞানী, তাঁর বই “Why we sleep” এ ঘুমের গূঢ়তত্ত্ব, গুরুত্ব এবং আধুনিক জীবনে এর যে ভয়াবহ অবমূল্যায়ন ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও গবেষণার মাধ্যমে মেলে ধরেছেন।

তিনি বলছেন-

“ত্রিশ বছর ধরে নিবিড় গবেষণার পর, আমরা এখন জানি একজন মানুষের “রিসাইকল রেট” অর্থাৎ পুনরুদ্ধারের চক্রকাল প্রায় ১৬ ঘণ্টা। অর্থাৎ, ১৬ ঘণ্টা জেগে থাকার পর মানুষের মস্তিষ্ক ব্যর্থ হতে শুরু করে। সামগ্রিক মানসিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে একজন মানুষের প্রতিরাতে সাত ঘণ্টার বেশি ঘুম প্রয়োজন।

শুধু সাত ঘণ্টা ঘুম পূর্ণ করেও যদি কেউ টানা দশ দিন পার করে, তবে তার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এমন পর্যায়ে নেমে আসে, যা ২৪ ঘণ্টা না ঘুমানোর সমতুল্য।

আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, এমন এক সপ্তাহ কম ঘুমানোর পর পরপর তিন রাত পুরো ঘুমালেও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ, শুধু সপ্তাহান্তে ঘুমিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, যখন আমরা ঘুমের ঘাটতিতে ভুগি, তখন আমাদের নিজেদের ঘুম-নিদ্রাহীন অবস্থাটি বোঝার সামর্থ্যও থাকে না। অন্যভাবে বললে, ঘুমের ঘাটতি থাকলে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না আমরা কতটা ক্লান্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়েছি।”

আমরা অনেকেই ভাবি, সপ্তাহের দিনগুলোতে ভালো ঘুম না হলে সপ্তাহান্তে ঘুমিয়ে তা পুষিয়ে নেব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘুম ব্যাংকের মতো নয়—যেখানে ধার করে পরে শোধ করা যায়। তিন রাত একটানা ভালো ঘুমিয়েও, আপনি সপ্তাহ জুড়ে ঘুমহীনতার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন না।

পুরুষদের মধ্যে, যারা প্রতি রাতে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার কম  ঘুমায়, তাদের অণ্ডকোষের আকার সাত ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুম-ওয়ালা পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হতে থাকে।

এ ছাড়া, যেসব পুরুষ নিয়মিত চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা -তাদের চেয়ে দশ বছর বেশী বয়স্ক মানুষের সমান। অর্থাৎ ঘুমের ঘাটতি পুরুষকে সেই দিক দিয়ে প্রায় দশ বছর বেশি বয়সী করে তোলে। নারী জননস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও আমরা একই রকম ক্ষতিকর প্রভাব দেখি।

এখান থেকে কেবল আরও ভয়ের কথাই শোনাব। 

গত প্রায় এক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, শেখার পরে (কোনো কিছু মুখস্ত অথবা কোনো কাজের প্রক্রিয়া আয়ত্ত্ব করে) ঘুম দরকার—নতুন স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য। 

তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, শেখার আগেও ঘুম প্রয়োজন, যাতে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য শোষণ করার মতো অবস্থায় থাকে।এই অবস্থাকে বলা  হচ্ছে ‘শুকনো স্পঞ্জ’। ঘুম ছাড়া মস্তিষ্কের স্মৃতি-প্রক্রিয়া ভেজা স্পঞ্জের মত হয়ে যায়—নতুন কিছু গ্রহণই করতে পারে না।

বয়স বাড়লে শেখার ক্ষমতা কমে, কারণ বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুমের মানও খারাপ হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে—গভীর ঘুমের এই অবনতি আর স্মৃতিহ্রাস পরস্পর জোরদারভাবে জড়িত, এমনকি আলঝাইমারের সাথেও।

গবেষকরা আরও বলছেন-

যদি কেউ তার প্রয়োজনীয় ঘুমের থেকে মাত্র এক ঘন্টা কম ঘুমান এতে হৃদরোগের আশংকা বাড়ে ২৪ শতাংশ। স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে ৪০ শতাংশ।

এক রাত যদি আপনি মাত্র চার ঘন্টা কম ঘুমান তবে আপনার শরীরের প্রতিরোধক সেল ৭০ শতাংশ হ্রাস পায়।

এক সপ্তাহ ছয় ঘণ্টা করে ঘুমালে —৭১১টি জিনের ক্রিয়াকলাপ বদলে যায়; রোগপ্রতিরোধী জিন নিস্ক্রিয় হয়, টিউমার-উৎপাদক, প্রদাহ-বর্ধক, স্ট্রেস-যুক্ত জিন সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ঘুম নিছক একটি দৈহিক প্রয়োজন নয়—এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত। ঘুমের অভাব কেবল ক্লান্তি বা অকার্যকারিতার জন্ম দেয় না, এটি ধীরে ধীরে মন, স্মৃতি, শরীর ও আত্মপরিচয়ের স্তম্ভগুলোকে ভেঙে ফেলে। 

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মাকোন্দো শহর যেন আমাদের আজকের এই ঘুমহীন আধুনিক সভ্যতার প্রতীক, আমরা ক্রমাগত ঝুঁকছি ঝুঁকির দিকে।

রাত জেগে মুভি নাইট,হ্যাঙ্গাউটস তো আছেই সংগে যোগ হয়েছে মুঠোফেনে ঘন্টার পর ঘন্টা অহেতুক স্ক্রলিং।ফলস্বরূপ বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি ।

আমরা যান্ত্রিকতায় মগ্ন হয়ে যে ঘুমকে বিলাসিতা ভাবি, সেই ঘুমই আমাদের শরীর ও মন প্রকৃতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও জটিল প্রক্রিয়া ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তাই,রাত জাগার ফ্যান্টাসিতে না ভুগে নিজের আট ঘন্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন।এই শরীরের চেয়ে বড় সম্পদ আর মানব জন্মে আর কিছু নেই।

Similar Posts