জীবন টসটসে চেরি

চিত্রকর্ম :কনক আদিত্য

বুদ্ধ একবার একটা গল্প বলেছিলেন-

একজন মানুষ একটা মাঠ পার হচ্ছিলো।হঠাৎ এক বাঘ তার সামনে এসে পড়ল। প্রাণ বাঁচাতে সে দৌড়াতে আরম্ভ করলো, আর বাঘ তার পিছু নিল।

দৌড়াতে দৌড়াতে সে পৌঁছালো এক গভীর খাদের কিনারায়। আর কোনো উপায় না দেখে সে দ্রুত একটা বুনো লতাকে আঁকড়ে ধরে নীচে ঝুলে পড়ল।

এখন উপরে দাঁড়িয়ে বাঘ গর্জন করছে, আর নিচে তাকাতেই সে দেখল -খাদের তলায় এক বাঘিনী মুখ হা করে খুলে অপেক্ষা করছে। তার জীবনের শেষ আশ্রয় হলো সেই একটিমাত্র লতা।

ঠিক তখনই দুটি ইঁদুর-একটি সাদা, একটি কালো-ধীরে ধীরে লতাটি কাটতে শুরু করল। মৃত্যু যেন চারদিক থেকে ঘনিয়ে এলো।

এমন সময় লোকটির চোখে পড়ল পাশে ঝুঁকে থাকা গাছের দিকে,যেখানে লাল টসটসে একটি পাকা স্ট্রবেরি ঝুলে আছে। এক হাতে লতা ধরে, আরেক হাতে সে ফলটি তুলে মুখে দিল।
আর মুহূর্তেই অনুভব করল—কী অসাধারণ মিষ্টি স্বাদ!

জীবন অনিশ্চিত। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ে জীবনের এক ছোট্ট বিস্ময়—একটি লাল রসাল স্ট্রবেরি। এই স্ট্রবেরি প্রতীক সুখের, আনন্দের, সৌন্দর্যের।মানুষ জানে বেদনা কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে তার অভিঘাত নিয়ে, তবু সে থামে, এক মুহূর্তের জন্য সেই ফলকে তুলে নেয় হাতে, আর তার মিষ্টি স্বাদ উপভোগ করে।এই স্বাদ নিয়েই সে জীবনের পথ হাঁটে,মৃত্যুর দিকে আগায়।

জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানে যে হাইফেন সেটিই মূলত আমাদের জীবন।এখানেই বিরাজ করে -সুখ,দুঃখ,হাসি,কান্না,রাগ,অভিমান,শংকা,আশংকার মতো হাজারো অনুভূতি। হাজারো টানাপোড়েন।

জীবনের বিষাদকে পরাজিত করা যায়না,কিন্ত তাকে পাশ কাটিয়ে কিছু মনোরম মুহূর্ত নিশ্চয়ই পাওয়া যায়।

এই গল্পে আমার অন্য একটা গল্প মনে আসে।কিয়ারোস্তামির সিনেমা টেস্ট অফ চেরী।যেখানে মৃত্যুর জন্য বের হওয়া বদিকে তার এক যাত্রী শোনায়-

আমি তোমাকে একটা ঘটনা বলি। আমার বিয়ের ঠিক পরপরই ঘটনা। প্রচণ্ড দুঃখে ছিলাম, এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। এক ভোরে গাড়িতে একটা দড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম—মরে যাব।
আমি মিয়ান শহরের দিকে চললাম। ১৯৬০ সাল।
একটা চেরী বাগানে পৌঁছালাম। তখনও অন্ধকার।
দড়ি একটা গাছে ছুঁড়লাম, লাগল না। আবার ছুঁড়লাম—তবুও না।
তখন গাছে উঠে দড়ি বাঁধতে গেলাম। হঠাৎ দেখি, নরম কিছু একটা আমার হাতে লেগেছে—চেরী!
মিষ্টি, রসালো!
একটা খেলাম, ভালো লাগল। আরেকটা খেলাম, তৃতীয়টা খেলাম।
হঠাৎ দেখলাম, সূর্য উঠছে পাহাড়ের পেছন থেকে। কী অসাধারণ আলো, প্রকৃতি!
এর মধ্যে স্কুলে যাওয়ার পথে কিছু বাচ্চা এলো। তারা গাছ ঝাঁকাতে বলল।
ফল পড়ল, তারা খেল। আমি খুশি হলাম। কিছু চেরী বাড়িতে নিয়ে গেলাম।
আমার স্ত্রী তখনও ঘুমোচ্ছিল। যখন জেগে উঠল, তাকেও দেখালাম। ও শিশুদের মত খুশি হল।
আমি মরে যেতে চেয়েছিলাম, আর ফিরে এলাম চেরী নিয়ে।
চেরী আমাকে বাঁচিয়ে দিল।
একটা চেরী আমার জীবন বাঁচিয়েছে।

চিত্রকর্ম -কনক আদিত্য।

Similar Posts

  • ঘুমহীনতার শহর ও স্মৃতির বিস্মৃতি: মাকোন্দো থেকে নিউরোসায়েন্স

    গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস “নিঃসঙ্গতার একশ বছর”-এর শহর মাকোন্দো।পুরো মাকোন্দোবাসীর এক আজব রোগে আক্রান্ত হলো,অনিদ্রা।  মাকোন্দো শহরে বুয়েন্দিয়া পরিবারে হাজির হয় একটি ছোট্ট মেয়ে রেবেকা, যার বাবা-মার কথা এই পরিবারের কেউ মনে করতে পারে না। এই বহিরাগত, অপরিচিত রেবেকাই প্রথম আক্রান্ত হয় অনিদ্রায়। সবার আগে তা বুঝতে পারে বাড়ির পরিচারিকা আদিবাসী বিসিতাসিয়োন এবং সবাইকে সে…

  • ঋত্বিক ঘটক এবং একটি বিষন্ন জীবন

    এই শহরে এতো দুঃখ কেনো হরিদাস?-বাড়ি থেকে পালিয়ে সিনেমার সংলাপ। “কে চায় দুঃখ? জীবন দুঃখ নহে বীরত্ব। “সুরমা ঘটককে এক চিঠিতে লিখেছিলেন সুরমা।সুরমা ঘটকের ঋত্বিক পড়ছিলাম। অনেক শিল্পী সাহিত্যিকের জীবন ঘেটে দেখেছি জীবনের এই অনিশ্চয়তা, অপ্রাপ্তি আর হতাশা একই। হয়তো প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। যুক্তি তক্কো গপ্পে বলেছিলেন- জীবন জীবিতের, জীবিতের ধর্ম বহতা অমোঘ দুর্নিবার। সব পুড়ছে,…

  • পুনরাবৃত্তি

    সৃজিত মুখার্জির দ্বিতীয় পুরুষ সিনেমায় একটা সংলাপ আছেনা এমন- প্রেমিক-প্রেমিকাদের তো কোনো ফিক্সড নাম হয়না।আজ যে রজত গতকাল সে’ই অমিত রায় ছিলো,গত পরশু সে মার্ক এন্টিনি ছিলো।জলটা একই থাকে,চোখটা বদলে যায়।চুমুটা একই থাকে শুধু ঠোঁট দুটো বদলে যায়। সত্যিই তাই। কবির সুমনের ,যতবার তুমি জননী হয়েছো ততবার আমি পিতা কিংবা জন্মের আগেও জন্ম জন্মের পরেও…

  • চাইতে থাকার গল্প

    আমি তো তোমাকে চাইতে থাকি। এদিকে সদ্য ঈষাণ দেয়া বাড়িটা দশতলা হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের জানালাগুলোতে আলো জ্বলে। কোনো এক তলার ছোট্ট বাচ্চাটা মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়।আমি তোমাকে চাইতে থাকি। বাচ্চাটা মায়ের হাত ছেড়ে একাই কোচিং যায়। বাড়ি ফিরে। তার বন্ধু হয়। সে আড্ডা দেয়।আমি তোমাকে চাইতে থাকি। বাচ্চাটাকে দেখিনা আর। এখন এক যুবক হেঁটে…

  • ইনিকো ইদিয়েদি সিনেমা এবং মিথ

    অন বডি এন্ড সৌল-নামে একটা হাঙ্গেরিয়ান সিনেমা আছে।যার পরিচালক ইদিকো ইনিয়েদি।সিনেমায় দুটো মানুষ একই স্বপ্ন দেখে ঘুমের ভেতর,তারা হরিণ-হরিণী হয়ে ঘুরে বেড়ায় বরফমোড়া বনে।সেই সিনেমায় লরা মার্লিনের একটা গান আছে যার লাইন-Forgive me Hera,I cannot stay.He cut out my tongue,There is nothing to save.আমি একসময় বুঁদ হয়ে শুনতাম এই গানটা।আমি ভাবলাম অনুবাদ করি।তখন মনে হলো…

  • কাকে যেনো খুঁজি

    পরিচালক,কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে অঞ্জন দত্ত প্রথম প্রেম নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি মধুবালার কথা বলেছিলেন।দশ বছর বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন মধুবালার।চলতি কা নাম গাড়ি-সিনেমা দেখে।এরপর তিনি সেই সিনেমা দেখতেই থাকলেন।তিনি নাকি ঠিক করে ফেলেছিলেন সারাজীবন সেই মানুষটার সঙ্গেই থাকবেন।একবার বাবার সংগে বম্বেতে গিয়েছেন তখন তার বারো বছর বয়স।তিনি দেখলেন মধুবালা বাসট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন।আরেকবার দিল্লীতে কুতুবমিনার দেখতে গিয়েছেন,তিনি…