ট্রেইন ড্রিমস
ট্রেইন ড্রিমস সিনেমার এক জায়গায় আর্ন বলে -এই পৃথিবী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সেলাই করা, আমরা যে সুতোই টানি না কেন,
তা সমগ্র নকশাকে কীভাবে বদলে দেয়,আমরা জানি না।
সত্যিই তাই।যে সেলাইয়ে এই পৃথিবী নির্মিত,সেই জোড়াগুলো আমাদের চোখের আড়ালে লুকানো। আমরা জানি না কী সরিয়ে নিলে কী ভেঙে পড়বে।
কী বাদ দিলে কী টিকে থাকবে আর কী ধ্বসে যাবে,তা বোঝার কোনো উপায় আমাদের নেই।
মানুষের কত একাগ্র চেষ্টা, কাজ ,,সম্পর্ক অচিরেই হাতছাড়া হয়ে যায়,ভেসে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির এক কোলাহলময় স্রোতে।

আমরা জানি না,কোনো একটি মানুষকে সরিয়ে দিলে কতগুলো জীবন ভেঙে পড়বে,কোনো একটি সিদ্ধান্ত কতগুলো ভবিষ্যৎ বদলে দেবে,কোনো একটি দেরি, কোনো একটি ভুল, কোনো একটি অনুপস্থিতি কত অদৃশ্য বিপর্যয়ের সূচনা করবে।
মানুষ খুব যত্ন করে জীবন গড়ে।ঘর তোলে।স্বপ্ন সাজায়।প্রিয় মানুষকে আগলে রাখে।ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার জন্য প্রতিদিন নিজের বর্তমানটুকু বিসর্জন দেয়।
তবু,
এক অনাহূত মুহূর্ত ,একটা দুর্ঘটনা,একটা হঠাৎ অনুপস্থিতি,একটা অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি,একটা ব্যাখ্যাতীত হারিয়ে যাওয়া। সব হিসেবকে তছনছ করে দেয়।
কেনো? তার উত্তর নেই কোনো। কারণ জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর মানুষের কাছে থাকে না।
যে “কেনো”–এর উত্তর মেলে না,মানুষ তাকে নাম দেয়—নিয়তি।
এই নিয়তির কাছে এসে সেই খসখসে ঝুলে যাওয়া সেলাইয়ের ফাঁক গলে ঝরে যাই আমরা। নিয়তি আসলে সেই অদৃশ্য হাত,
যে আমাদের জীবনের বুনন ছিঁড়ে দেয় কোনো সতর্কতা ছাড়াই।
ট্রেইন ড্রিমসে রর্বার্ট তার স্ত্রী-কন্যাকে তার কাজের জায়গায় নিয়ে যেতে চায়না কারণ অরক্ষিত পরিবেশ।জায়গাটা নিরাপদ নয়।
সে তাদের রক্ষা করতে চায়।
সে ভালোবাসাকে সুরক্ষার মধ্যে রাখতে চায়।
অথচ কী নিষ্ঠুর পরিহাস!যে নিরাপত্তার জন্য সে তাদের দূরে রাখে,
সেই দূরত্বের মধ্যেই দাবানল এসে
তার সমস্ত পৃথিবীকে গ্রাস করে নেয়। সুরক্ষায় মোড়া ,সেই ভালো চাওয়ায় দাবানল এসে সমস্ত লেলিহান শিখায় গ্রাস করে।
যে তার মা-বাবা কে জানেনা,তারা কোথায় হারিয়ে গেলো জানেনা,সে কি করে এলো জানেনা।সে এক নতুন না জানার মধ্যে ঢুকে পড়ে।তার স্ত্রী-সন্তান কোথায়,সে এখন আর জানেনা।কিংবা মানেনা।

মানুষ যা মানতে পারেনা তাকে সে অপেক্ষার পোশাক পরিয়ে নিজের সঙ্গে রাখে।
কিছু শোক এত গভীরযে তাকে সমাধিস্থ করা যায় না,তাকে কেবল বুকের ভেতর বসিয়ে রাখা যায়।
রবার্টও তাই করে,অপেক্ষা করে।নতুন করে ঘর বানায়।আবার কাঠ কাটে। আবার জানালা বসায়।
সেই বানানো ঘরে প্রতিটা দৃশ্যে আমার কেবল বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতার কথা মনে পড়ে-
তার ঘর পুড়ে গেছে
অকাল অনলে ;
তার মন ভেসে গেছে
প্রলয়ের জলে।
তবু সে এখনো মুখ
দেখে চমকায়,
এখনো সে মাটি পেলে
প্রতিমা বানায়।
মানুষ আসলে ভেঙে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকার জন্যই নির্মিত।


