কাকে যেনো খুঁজি

পরিচালক,কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে অঞ্জন দত্ত প্রথম প্রেম নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি মধুবালার কথা বলেছিলেন।দশ বছর বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন মধুবালার।চলতি কা নাম গাড়ি-সিনেমা দেখে।এরপর তিনি সেই সিনেমা দেখতেই থাকলেন।
তিনি নাকি ঠিক করে ফেলেছিলেন সারাজীবন সেই মানুষটার সঙ্গেই থাকবেন।
একবার বাবার সংগে বম্বেতে গিয়েছেন তখন তার বারো বছর বয়স।তিনি দেখলেন মধুবালা বাসট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন।আরেকবার দিল্লীতে কুতুবমিনার দেখতে গিয়েছেন,তিনি দেখলেন সিঁড়ি বেয়ে মধুবালা উঠছে।
তার মনে হলো,এখন যদি তাকে কিছু না বলেন তবে কবে বলবেন।কিন্তু সে চলে গেলো,মানে মধুবালা।তার আর বলা হলোনা।

অঞ্জন দত্ত আবার উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলেন,সত্যিই কি অই বাসট্যান্ডে,কুতুব মিনারে কি সত্যি সত্যি মধুবালা ছিলেন?

বুদ্ধদেব বলতে থাকলেন,না মধুবালা নয়।মধুবালার মতো দেখেছিলাম কাউকে।
একজন থেকেই যায়,যাকে তুমি খুঁজে বেড়াও সারা জীবন ধরে।দেখা হয়না কখনও। দেখাই হয়না তার সঙ্গে।

এই “মতো” শব্দটাই আসল। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি, কুতুব মিনারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা সেই মেয়েটি সবই বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি কোনো অঞ্চল। তার সাথে কোনোদিন দেখা হবার নয়।
সে আসে কবিতায়,গল্পে,সিনেমায়,কিংবা ক্যানভাসে।

কবির সুমন বলেছিলেন,একবার হাওড়া ব্রিজের দিকে তিনি তাকিয়ে ছিলেন।অজস্র মানুষের ভিড়।সেই ভিড়ে অফিস ফেরত এক তরুণীর দিকে তার চোখ থমকে গেলো।আর মনে আসতে থাকলো “প্রথমত আমি তোমাকে চাই”।
কবির সুমন বলছিলেন তিনি যতই পরের লাইনগুলোর দিকে এগোচ্ছিলেন ততোই মেয়েটার মুখ মুছে যাচ্ছিলো।তিনি কেবল শহর দেখতে পাচ্ছিলেন।কেবল শহর!

কিংবা দান্তের বিয়াত্রিচ,যার এক ঝলক তাকে সারাজীবন তাড়া করেছে।

ইতালীয়ান কবি পের্ত্রাক এক গির্জায় দেখেন লরা নামের এক নারীকে। তার সঙ্গে কখনও কোনো সম্পর্ক হয়নি তার। কথা হয়নি।হয়তো লরা তাকে চিনতেনই না।
তবুও সেই এক মুহূর্তের দেখাই তাকে এমনভাবে তাড়া করে ফেললো যে তিনি শত শত সনেট লিখে ফেললেন।

সব জীবনেই হয়তো এমন একজন থেকে যায় যাকে কখনো পাওয়া যায় না,সে হারিয়েও যায় না। তার সঙ্গে পরিচয় হয়না।সে অচেনাও হয়না,চেনাও হয়না।

তার মুখের আদল ভেসে বেড়ায় শত মুখে,প্রিয় জায়গায়,বাসে-ট্রেনে-ভিড়ে।প্রেমে-অপ্রেমে-বিরহে।

কাকে যেনো খুঁজি আমরা!

সে রয়ে যায় শুধু একটা খোঁজ হয়ে।যাকে খুঁজতে খুঁজতে নতুন কোনো সৃষ্টিকে পাওয়া যায়। যে নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে কবিতার লাইনে, গল্পের চরিত্রে, সিনেমার ফ্রেমে, কিংবা কোনো নিঃশব্দ ক্যানভাসে।

সে কে জানা নেই।কিন্তু তাকে খোঁজার মধ্যেই আমাদের শিল্প, আমাদের ভাষা, আমাদের একাকীত্বের সৌন্দর্য জন্ম নেয়।

Similar Posts

  • চলে যাবে বলে….

    তবু নিঃশব্দে থেকে যাবার মত চলে যাচ্ছো তুমি।কোনো গাঢ় জ্যোস্নার পথ ধরে।আমার ভেতরে কেবল তোলপাড়। আর যে কোনো ফেরা নেই!আমি জানি। আমি জানি, এই প্রস্থান অনিবার্য।এ এক একমুখী যাত্রা,ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে দিয়ে তুমি প্রবেশ করছো এমন এক নীরবতায়-যেখানে স্মৃতিও আর পৌঁছাতে পারে না। আমার কোনো ভাষা নেই,যা দিয়ে ফেরানো যেতো তোমাকে।সমস্ত চলে যাবার…

  • রেঁনে ম্যাগরিথ

    চিত্রকর্মের নাম -দি লাভার।রেঁনে ম্যাগরিথের আঁকা।আমার বড় প্রিয়। দুটি মানুষের চুম্বনের দৃশ্য,কিন্তু তাদের মুখ ঢাকা সাদা কাপড়ে।প্রথম দেখায় অদ্ভুত লাগে, কিছুটা অস্বস্তিকরও।পরক্ষণেই মানুষের সম্পর্কের গভীরে থাকা সেই পুরনো সত্য আরো প্রকট হতে থাকে।মানুষ যতই কাছে আসে,তত একে অপরকে আর দেখতে পায়না।চোখের এতো কাছে,যে দৃশ্যত আড়াল হতে থাকে। শঙ্খ ঘোষের সেই কবিতার লাইনগুলো মনে আসে-কে কাকে…

  • লায়লা মজনু

    পারস্যের সপ্তম শতকের একজন কবি যার নাম কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ।যার প্রেম কাহিনী পারস্যের লোককাহিনী হয়ে ঘুরে ফিরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।পরবর্তীতে নিজামী গঞ্জভী – রচিত এক মহাকাব্য এই কিংবদন্তিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে। কী?-এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই চেনা যায়নি কায়েস ইবনে-আল মুলাওয়াহকে।কিন্তু জানেন কী,ইনি আমাদের খুব পরিচিত একজন! খুলে বলছি। লায়লা-মজনুর নাম জানেন না এমন কী কেউ…

  • ভায়োনিক স্ক্রিপ্ট

    আমি প্রায় সময় হলিউডের ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমাগুলো দেখে দেখে ভাবতাম এরা কী করে এতো কল্পনাপ্রবণ স্ক্রিপ্ট লিখতে পারে।কোথায় পায় ওরা একেকটা সিম্বল তৈরীর রসদ! পৃথিবীতে এতো আশ্চর্য সব বিষয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে,প্রাচীন।আমাদের বাঙালী বেগার কাটা জীবন সেসবের খোঁজ কী জানে! ঊনিশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উইলফ্রেড ভায়োনিক নামে এক পোলিশ ভদ্রলোক,যিনি বিরল সব বই সংগ্রহ করতে…

  • ও আমার নিঃস্ব চাঁদ

    মাঝে মাঝে আমার সেই রাজার গল্পটা মনে পড়ে,যার দূরারোগ্য ব্যাধির নিরাময়ের জন্য সুখী মানুষের পোশাকের খোঁজ পড়ে পুরো রাজ্যে।অবশেষে সুখী হিসেবে যাকে পাওয়া যায় তার গায়ে কোনো পোশাকই থাকেনা।সেই গল্প পরে সুখী মানুষের উস্কখুস্ক এক মুখ এঁকে ফেলেছিলাম সেই কবে।সুখী মানুষের কথা ভাবলে আমার এখনও সেই গল্পই মনে পড়ে। আনা কারেনিনাতে তলস্তয় বলেছিলেন-সব সুখী পরিবারের…

  • নিজেকে নিয়ে নিজের দিকে যাত্রা

    ইউভাল নোয়া হারারি  তার ” টুয়েন্টি ওয়ান লেসন ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ” বইয়ে এক জায়গায় বলেছেন – “যদি মশা আমাদের কানের কাছে ভনভন করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, আমরা সহজেই জানি কীভাবে তা মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু যদি কোনো চিন্তা আমাদের মনে ভনভন করে এবং রাতে ঘুমাতে না দেয়,আমরা বেশিরভাগ মানুষই জানি না কীভাবে…