গল্প হলেও সত্যি

ফ্রয়েড দাবী করেছিলেন তিনি যে কারও মানসিক স্থিতি বলতে পারেন।সেখান থেকেই তিনি ভিঞ্চির মনঃস্তত্ব নিয়ে একটা পুরো বই লিখে ফেলেছিলেন।

ফ্রয়েড সেই বইয়ে লিওনার্দোর দ্য ভিঞ্চির চিত্রকলা এবং তার নোটবুকের একটি বিশেষ শৈশবস্মৃতি বিশ্লেষণ করে তার ব্যক্তিত্ব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

ভিঞ্চি তার একটি নোটবুকে লিখেছিলেন যে, দোলনায় থাকাকালীন একটি পাখি তার কাছে এসেছিল এবং তার লেজ দিয়ে ভিঞ্চির মুখে আঘাত করেছিল। ফ্রয়েড এই পাখির ওপর ভিত্তি করে তার সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটি দাঁড় করান।

কিন্তু সেই গোটা বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণিত হয়,সঙ্গে ফ্রয়েডকেও ভুল বলতে শুরু করে লোকে।

ফ্রয়েড লিওনার্দোর মূল ইতালীয় লেখাটি পড়েননি, বরং একটি ভুল জার্মান অনুবাদ পড়েছিলেন।যেখানে চিলকে শকুন উল্লেখ করা হয়েছিলো
ফ্রয়েড শকুনকে ঘিরে তার বিশ্লেষণ সাজান।

কিন্তু ফ্রয়েডের বিশ্লেষণ ভুল ছিলো না।ফ্রয়েড ভুল বলেননি।ভুল ছিলো তার কাছে পৌঁছানো তথ্যটি।

ইউভাল নোয়া হারারি একটা চমৎকার কথা বলেছেন-মানুষ যে ভালো কিংবা মন্দ তা বিচার হয় তার সিদ্ধান্তে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তথ্যের উপর। ভালো মানুষকে যদি ভুল তথ্য দেওয়া হয়, তারা ভুল সিদ্ধান্তই নেবে।
সমস্যাটা আমাদের তথ্যেই।

এইটুকু লিখতে লিখতে একটা অতি প্রাচীন ইদ্দিশ লোককথা মনে পড়লো।

অনেক আগে এক ছোট গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে দুই বোন বাস করত। দুজনেই অপূর্ব সুন্দরী, এতই রূপবতী যে গ্রামবাসী গর্ব করত যে এমন কন্যারা তাদের গ্রামে থাকে। এক বোনের নাম ছিল সত্য আর অন্যজনের নাম গল্প। দুজনে খুব মিলেমিশে হাসিখুশিভাবে সেই গ্রামে থাকত।
একদিন সেই গ্রামে এক ফকির এল। দুই বোন সেই ফকিরের এত সেবা-যত্ন করল যে খুশি হয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাদের একটি আয়না উপহার দিয়ে গেলেন। সেই প্রথমবার দুই বোন আয়না দেখল। সবার আগে সত্য আয়নাটা হাতে নিল, নিজেকে দেখল আর অহংকারের সাথে বলল, “আরে, আমি কত সুন্দর! আমার চেয়ে বেশি সুন্দর আর কেউ হতেই পারে না।”
ওর মনে জেদ আর গর্ব চেপে বসল।
এরপর গল্পের পালা। গল্প আয়নাটা নিয়ে নিজেকে দেখল আর বলল, “না, আমিই বেশি সুন্দরী।” এই নিয়ে দুই বোনের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেল। শেষমেশ একটা বাজি ধরল তারা। ঠিক হলো, দুজনে একে একে গ্রামের মাঝখানের চৌরাস্তা পর্যন্ত হেঁটে যাবে। যাকে দেখে গ্রামের মানুষ বেশি হাততালি দেবে, বাহবা দেবে আর শিস বাজাবে, সেই বোনই জিতে যাবে।
প্রথমেই সত্য বের হলো। মনে ভীষণ গর্ব তার রূপ দেখে তো মানুষ পাগল হয়ে যাবে! কিন্তু যেই সে গ্রামের রাস্তায় পা রাখল, ঠিক উল্টোটা ঘটল। সত্যকে দেখে মানুষ ভয় পেয়ে গেল! যে যার মতো দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল, দরজা-জানলা বন্ধ করে খিল তুলে দিল। সত্য খুব অবাক হলো। সে ভাবল এভাবে তো আমি হেরে যাব। হাঁটতে হাঁটতে সে যখন চৌরাস্তায় পৌঁছাল, দেখল পুরো গ্রাম যেন জনশূন্য হয়ে গেছে।
তখন সত্য মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য এক অদ্ভুত ফন্দি আঁটলো। সে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের সব পোশাক খুলে ফেলল। সে ভাবল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তাকে দেখলে বোধহয় মানুষ ঘর থেকে বাইরে আসবে। কিন্তু হলো তার ঠিক বিপরীত।
দু-একজন যারা আশেপাশে ছিল, তারাও ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। সত্য একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
দূর থেকে গল্প এসব দেখছিল। এবার গল্প সাজগোজ শুরু করল। সে রেশমি লহেঙ্গা পরল, মাথায় লাল ওড়না নিল, চোখে কাজল আর পায়ে নূপুর পরল।
এবার গল্পের পালা।
গল্প যেই গ্রামে প্রথম পা রাখল, তার পায়ের নূপুরের রিনরিন শব্দ বাতাসে ছড়াতে থাকলো।আর সেই শব্দের সাথে সাথে ঘরের বন্ধ খিলগুলো খোলার আওয়াজ আসতে লাগল। গল্প যেখান দিয়ে যাচ্ছিল, মানুষ মুগ্ধ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। সবাই তার পেছনে নাচতে, গাইতে আর বাহবা দিতে শুরু করল।
হাঁটতে হাঁটতে গল্প সেখানে পৌঁছাল যেখানে সত্য নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। গল্প সবার আগে সত্যের পোশাকগুলো তুলে তাকে পরিয়ে দিল।
তারপর বলল, সত্য, আজ একটা কথা মনে গেঁথে রাখো—মানুষ সত্যি দেখতে একদম পছন্দ করে না, আর নগ্ন সত্য তো একেবারেই নয়
গল্প সত্যের হাত ধরে পুরো গ্রাম ঘুরল। গ্রামের প্রতিটি শিশু, বৃদ্ধ, এমনকি পশুরাও তাদের পেছনে নাচতে গাইতে লাগল। যেন গ্রামে উৎসব চলছে কোনো।
তখন গল্প সত্যকে বলল, সত্য, যখনই মানুষকে সত্যি দেখানোর প্রয়োজন হবে, তোমাকে গল্পের সৌন্দর্যের আশ্রয় নিতেই হবে। গল্পের অলংকার আর রূপ ছাড়া মানুষ সত্যকে গ্রহণ করতে পারে না।

তাই সত্যকে লোকে গল্পেই ভালোবাসে শুনতে।চাছাছোলা সত্য শোনার চেয়ে তাই ঈশপের গল্প শুনতে ভালোলাগে,ভালোলাগে জেন গল্প শুনতে।
আপন জনেরাই সবচেয়ে গভীর ক্ষত হয় ,নিয়তির বলি হয়ে কত কি যে ঘটে বলার জন্যেই মহাভারতের অবতারণা হয়।
জগৎ আসলে গল্পময়ই।
আমি একটা গল্প,আপনি একটা গল্প,সমস্তই একটা গল্প।

আর জীবনে ভুল তারাই করে যারা কাজ করে। ভুল থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ সেই ভুলগুলোই একদিন অভিজ্ঞতার গল্প হয়ে আমাদের সত্যকে আরও সুন্দর করে তোলে।

Similar Posts

  • ডুব

    নিজের ভেতর ডুবে যেতে যেতে দেখা হয়ে যায় তার সাথেডেবে যাওয়া রথের চাকার মতো গেঁথে যাওয়াএ দেখা না হলেই বোধহয় ভালো হতো।কবেই তো থেমেছে গান, ভেঙেছে আসরশেষ শ্রোতাও ফিরে গেছে ঘরঅজানা টঙ্কারে কালিঝুলি মুছে গেয়ে ওঠেস্মৃতির অরুণ সেতারনিমেষে জ্বলে ওঠে রঙমশালঅনলের বিস্তৃত শোভাযাত্রানিশান্তের বহতা হাওয়াএই মলাটে নোঙর করা জীবন সমগ্রতোমার সাথে দেখা না হলেই ভালো…

  • চলে যাবে বলে….

    তবু নিঃশব্দে থেকে যাবার মত চলে যাচ্ছো তুমি।কোনো গাঢ় জ্যোস্নার পথ ধরে।আমার ভেতরে কেবল তোলপাড়। আর যে কোনো ফেরা নেই!আমি জানি। আমি জানি, এই প্রস্থান অনিবার্য।এ এক একমুখী যাত্রা,ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে দিয়ে তুমি প্রবেশ করছো এমন এক নীরবতায়-যেখানে স্মৃতিও আর পৌঁছাতে পারে না। আমার কোনো ভাষা নেই,যা দিয়ে ফেরানো যেতো তোমাকে।সমস্ত চলে যাবার…

  • হৃদয়চিত্র

    চারপাশে কাচের দেয়াল তুলে দিয়ে স্বস্তিতে থাকতে চেয়েছিনিজেকে বন্দী করতে করতে একবিন্দু হয়ে গেছিটের পাইনি..জ্বরের ঘোরে একটা হাত খুঁজতে গিয়েপাশের ঘর থেকে ভেসে এসেছে মর্গের শীতলতারাস্তা পার হওয়া শিখবার আগেই আঙ্গুল থেকে মুছে গেছে নির্ভার হাতের ছাপএখন পাশে থাকা গল্পগুলো কেবল বলয়বিকেলের মৃত শরীরে ফেরে রাত পুরনো প্রবাদেঅন্ধকারের সময়সীমা পেরোলেই ভোরথিয়েটার পাড়ার মগ্ন মঞ্চের মতো মহড়ায়…

  • অর্কিডের ঠোঁট

    যে ছায়া তুমি পুতে দিয়েছো অন্য কারও বুকেধরো, কোনো একদিন সে আর বাড়ি ফিরলোনা।তুমি খুঁজতে লাগলে ব্লেড, স্লীপিং পিল, উচু কোনও দালান।জেনো, এমন অনেকদিন আমারও গ্যাছে জেনো,বহুদিন আমি ফিরিনিএকাই হেঁটেছি ফুটপাত অন্ধকারের গতিবুুকের ভেতর ভেঙেচুুড়ে ঘরবাড়িঅভিমানে নিলাম ডেকে একান্ত শহরভিড়ের পায়ে পায়ে চলে গিয়েছে কোথায়, কে জানে!এভাবেই এক একটা দিন গ্যাছেতোমাকে মুছে ফেলেছেঘড়ির কাঁটার সূ্ক্ষ্ম…

  • লায়লা মজনু

    পারস্যের সপ্তম শতকের একজন কবি যার নাম কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ।যার প্রেম কাহিনী পারস্যের লোককাহিনী হয়ে ঘুরে ফিরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।পরবর্তীতে নিজামী গঞ্জভী – রচিত এক মহাকাব্য এই কিংবদন্তিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে। কী?-এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই চেনা যায়নি কায়েস ইবনে-আল মুলাওয়াহকে।কিন্তু জানেন কী,ইনি আমাদের খুব পরিচিত একজন! খুলে বলছি। লায়লা-মজনুর নাম জানেন না এমন কী কেউ…

  • রূপ

    সে পুরুষতার পেশীর দৃঢ়তা, যেনো কোনও দ্বীপ জাগলো আড়মোড়া ভেঙেযেনো কোনও আলো জলাধারেপানকৌড়ি হয়ে আমি ডুব মারি সে সুন্দরে।সে চোখ তাকিয়েআমার আঙুল সুর তুলে নেয় একতারায়তুমি দেখোনি তাকেতার শরীর তেপান্তরের মাঠআমি সারারাত জেগে বাঁশি বাজাই।