থ্রু দ্য অলিভ ট্রি

মন ভালো না লাগলে আমি আব্বাস কিয়ারোস্তামির “থ্রু দ্য অলিভ ট্রি” দেখি মাঝে মাঝে।
একটা দৃশ্য শ্যুট করা হয়ে গেলে পুরো টিম যখন অন্য দৃশ্যের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন সেই ব্যস্ততার মাঝখানে, যেন সময় একটু থেমে যায়-হোসেইন আর তাহিরাহ শ্যুট হওয়া দৃশ্যের মতোই সেঁটে থাকে।
হোসেইন তাহিরাহকে খুব সাধারণ কিছু কথা বলে। এমন কথা, যেগুলো আলাদা করে শোনার মতো কিছু নয়।সে বলতে থাকে- “তুমি ভেবোনা আমি এই দৃশ্যের ছেলেটার মত।আমি আমার মোজা ঠিক জায়গায় রাখবো,আমার কাপড় গুছিয়ে রাখবো,বাজারে যাবার আগে রান্না করে খেয়েও নিবো।তুমি শুধু খুশি থেকো।আনন্দে থেকো।

আমি বিয়ে করতে চাই শুধু সুখী হওয়ার জন্য,কেউ আমার জন্য রান্না করার বা আমার কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখার জন্য নয়।

আমি চাই তুমি তোমার পড়াশোনা চালিয়ে যাও, আর আমি কাজ করি। আমার একটাই চাওয়া,তোমার সুখ। আমি তোমাকে সুখী করতে চাই।”

আমার মনটা ভালো হয়ে যায় এই দৃশ্যে এসে।প্রেম এতো সহজ সুন্দর হয় এই ভেবে।
ভালোবাসা কেবল কাউকে নিজের মতো করে পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে তার মতো করেই তাকে থাকতে দেওয়া।

আগে পুরোটা সিনেমা জুড়ে আমি নিশপিশ করতাম তাহিরাহ কেনো কিছু বলছেনা,বলে না কেনো এই আক্ষেপে।

এখন এই নীরবতাকেই সহজাত সুন্দর মনে হয়।মনে হয় সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে হয় না।
কিছু নীরবতা থাকে, যা কোনো গ্রহণ নয়, কোনো প্রত্যাখ্যানও নয়
বরং এক অদৃশ্য, অসমাপ্ত সম্ভাবনা।
এই নীরবতার অন্যরকম এক যাত্রা আছে।
যেখানে কেউ কারো দিকে এগোয়, আবার কেউ থেমে থাকে,
একই ফ্রেমের ভেতরে, একই আবহে,একই অনিশ্চয়তায় জড়িয়ে থাকে।

শেষ দৃশ্যে সারি সারি জলপাই গাছের ভেতর দিয়ে যখন তাহিরাহ চলে যাচ্ছে,তার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে পেছনে ছুটছে হোসেইন,ক্রমেই দূরে দূরে যাচ্ছে দুজনেই।আমি সেখানে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে লিখে ফেলি-

তুমি প্রত্যাখ্যান হলে-
আমি কোনো প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস লুকোনো বিকেল।

উন্মাদনা নেই,উন্নাসিকতা নেই এক অদ্ভুত স্থিরতা দুজনকে ঘিরে থাকার নামই বোধহয় প্রেম।
প্রেম অনেকরকম হয়,তার প্রকাশও অনেকরকম হয়।
আমরা কেবল এক রকম প্রেমের কথা জানি।আমরা কেবল এক রকমের প্রেমকেই প্রেম ভাবি।
প্রেম বলে যা কিছুকে আমরা কুক্ষিগত করে রাখি সেগুলোও কি আদৌ প্রেম?

ভালোবাসা দেয়া, ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালোবাসাকে ধারণ করা এই পুরো প্রক্রিয়াটিই শিখবার,দীর্ঘ চর্চা করবার বিষয়।
কাউকে পেয়ে গেলাম মানে সব পাওয়া হলো এমনও নয়,আবার কাউকে হারালাম মানেই হেরে গেলাম তেমনও নয়।

প্রয়াত রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জির মৃত্যুর কিছু দিন আগের একটা সাক্ষাৎকার দেখছিলাম।
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তার কাছে তার জীবনের সবচেয়ে প্রেমময় কথা বা গল্প কোনটা।
উত্তরে তিনি বলছিলেন -তার পুত্রের জন্মের সময় প্রিয়াঙ্কার পাশে তিনি যখন ওটিতে বসে আছেন।অপারেশন চলছে সামনে বিশাল পর্দা।পর্দার ওপারে যখন পুত্রের জন্ম নিশ্চিত করা কান্না শুনতে পেলেন তখন স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা বলছেন -আমার নাকটা একটু চুলকে দেবে!
রাহুল বলছিলেন,এরচেয়ে রোমান্টিক কথা তিনি এই জীবনে কোনোদিন শোনেননি।এরচেয়ে প্রেমময় কথা হতে পারেনা।

Similar Posts

  • কুকুর

    আমিও কুকুর। তুমি ডাকলে আজও দরোজায় এসে দাড়াই তুমি ডাকলে এতোসব দুর্যোগের ভেতর যেনো আজও আমার উৎসব আছে যেনো আমিও রুঢ়তা ভুলে জীভ বের করে দাঁড়িয়ে থাকা সহজ কলমীলতা তুমি ডাকলে আমি আমার ভেতরে আমি ভেজা বিস্কুটের মতো গলে গলে পড়া অথচ কতবার ফিরিয়ে দিয়েছো ডেকে বলেছো, দুঃখটা সেরে গেছে দরোজাটা ওদিকে কতোবার তোমার নিষ্পাপ…

  • মানুষ

    মন সরে গেলে স্মৃতি থেকে যায়। সেখানে সাঁতার কাটে চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস। সময়ের জালে নিজেকে জড়াতে জড়াতে আরও অস্ফুট হয়ে ওঠে মানুষ। মানুষই মানুষকে ছেড়ে যায়। আবার মানুষই অপেক্ষা করে দরোজা খুলে। যে মানুষটা ছেড়ে গেলো তার উপর বিশ্বাস হারিয়ে আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে মানুষ। রাস্তার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে আবারও নতুন করে চাইতে…

  • ইনিকো ইদিয়েদি সিনেমা এবং মিথ

    অন বডি এন্ড সৌল-নামে একটা হাঙ্গেরিয়ান সিনেমা আছে।যার পরিচালক ইদিকো ইনিয়েদি।সিনেমায় দুটো মানুষ একই স্বপ্ন দেখে ঘুমের ভেতর,তারা হরিণ-হরিণী হয়ে ঘুরে বেড়ায় বরফমোড়া বনে।সেই সিনেমায় লরা মার্লিনের একটা গান আছে যার লাইন-Forgive me Hera,I cannot stay.He cut out my tongue,There is nothing to save.আমি একসময় বুঁদ হয়ে শুনতাম এই গানটা।আমি ভাবলাম অনুবাদ করি।তখন মনে হলো…

  • অন্তরীন:সিনেমার ভাষায় নীরবতা

    একটা উড়ো ফোনের ওপাশে এক নারী কন্ঠ খুব সহজাতভাবে জানতে চান-ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে? উত্তরে না বললে ফের বলে ওঠেন-নাহ,বেশ মজাতো।এখানে হচ্ছে,হাওয়াও দিচ্ছে।এবার এপাশ যখন প্রশ্ন করে আপনি কী চান?ওপাশের কন্ঠটি উত্তর দেয় -আমি কথা বলতে চাই। দৃশ্যটা মৃণাল সেনের অন্তরীণ সিনেমার।অন্তরীণ মানে আটকে থাকা,নিজের ভেতরে শৃঙ্খলিত হয়ে থাকা। নিজেকে বলবার আকুলতা মানুষের অনেকটা তৃষ্ণার মত।মানুষ…

  • হৃদয়চিত্র

    চারপাশে কাচের দেয়াল তুলে দিয়ে স্বস্তিতে থাকতে চেয়েছিনিজেকে বন্দী করতে করতে একবিন্দু হয়ে গেছিটের পাইনি..জ্বরের ঘোরে একটা হাত খুঁজতে গিয়েপাশের ঘর থেকে ভেসে এসেছে মর্গের শীতলতারাস্তা পার হওয়া শিখবার আগেই আঙ্গুল থেকে মুছে গেছে নির্ভার হাতের ছাপএখন পাশে থাকা গল্পগুলো কেবল বলয়বিকেলের মৃত শরীরে ফেরে রাত পুরনো প্রবাদেঅন্ধকারের সময়সীমা পেরোলেই ভোরথিয়েটার পাড়ার মগ্ন মঞ্চের মতো মহড়ায়…

  • পুনর্বার

    মর্মর অশ্রুত পাতাদের ভেঙেতোমার বাড়ির ঘাসে শিশুর হাতের ছোঁয়ামৃত ছিলাম –তুমি আবার জন্মালে প্রেমিক হয়েদক্ষিণে হাওয়ার উতলেআমি এখনও চড়ে বসি অচিন ঘোড়ায়ঘাস, লতাপাতা আর প্রজাপতির আদিম দ্বীপেবুনে রাখি কোমল বয়েসমাঠের ধারের রাখাল বাঁশিপথ ভুলিয়ে দেয় বহু মর্মকথারআমাকে ধরে রাখো-বিরলপ্রজ বৃক্ষের শিকড়েআদিম গুহায় ধরে থাকা প্রদীপে।