শিরি – ফরহাদ

ছোটবেলায় শিরি-ফরহাদের অলৌকিক প্রেমের গল্প শুনতাম।শিরির গায়ে আঘাত করলে নাকি ফরহাদের শরীরে সেই আঘাত ভেসে উঠতো।

গতকাল থেকে প্রচন্ড জ্বর।আমি জানতাম ঠিক আমার সহ-জনও অসুস্থ হবেন।আমি অসুস্থ হলে নির্ঝরেরও আর শরীর চলেনা।এই যুগের শিরি-ফরহাদ!

শিরিন ছিলেন এক আরমেনীয় রাজকুমারী।সৌন্দর্যে অপূর্ব, গুণে অতুলনীয়। তার রূপের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। পারস্যের রাজপুত্র খসরু (বা খসরু পারভেজ) তার নাম শুনে মুগ্ধ হন, আর পরে তার রূপ দেখে হৃদয় হারান। শিরিনও তার প্রতি অনুরক্ত হন। দুজনের প্রেম শুরু হয় সুর, বার্তা, চিঠি আর অপেক্ষার মধ্য দিয়ে।

কিন্তু ভাগ্য এত সহজ ছিল না।

এই প্রেমের ঠিক মাঝখানে আবির্ভূত হন এক ভাস্কর, স্থপতি ও প্রকৌশলী,ফরহাদ। তিনি ছিলেন সাধারণ এক শিল্পী। একদিন দুর্গের কাছে শিরিনকে দেখে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যান তিনি।

খসরু জানতেন ফরহাদের প্রেম তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তিনি ছিলেন রাজা।তিনি চাননি তার মতো একজন ক্ষমতাবান পুরুষকে এক সাধারণ শিল্পীর সাথে তুলনা করা হোক।

তাই তিনি ফরহাদকে এক চ্যালেঞ্জ দেন, যেন সে পর্বত খুঁড়ে তার ভেতর দিয়ে জল এনে দেয় শিরিনের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল ফরহাদকে এমন অসম্ভব এক কাজে নিয়োজিত করা, যাতে সে ক্লান্ত হয়ে প্রেম ত্যাগ করে।

কিন্তু ফরহাদ প্রকৃত প্রেমিক,ভালোবেসেছিলেন, আর ভালোবেসেছিলেন চিরদিনের মতো।

ফরহাদ দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পাথর কেটে এগিয়ে চলল,শিরিনের মুখে একবার হাসি আনবে বলে। সে পাথর কাটে, রক্ত ঝরায়, গান গায়, দুঃখ লুকায়।

শিরিন মাঝে মাঝে গোপনে আসে, দূর থেকে দেখে, চোখের জল ফেলে। কিন্তু কখনো বলে না ভালোবাসি।

রাজা খসরু, ফরহাদের কাজে সাফল্য দেখে ভয় পেলেন। যদি সে জয়ী হয়, তবে শিরিনের হৃদয় পুরোপুরি তার হয়ে যাবে।

তাই তিনি এক নিষ্ঠুর মিথ্যা রটালেন।বললেন, “শিরিন মারা গেছে।”

ফরহাদ শুনেই স্তব্ধ।
সে আর এক মুহূর্তও বাঁচতে চায় না।

সে নিজের কুঠার নিজের মাথায় মেরে আত্মহত্যা করে।

শিরিন খবর শুনে ছুটে আসেন।দেখেন ফরহাদের নিথর দেহ,পাথর খোড়া নদী রক্ত হয়ে তার দিকে বয়ে যাচ্ছে।

Similar Posts

  • জীবন টসটসে চেরি

    বুদ্ধ একবার একটা গল্প বলেছিলেন- একজন মানুষ একটা মাঠ পার হচ্ছিলো।হঠাৎ এক বাঘ তার সামনে এসে পড়ল। প্রাণ বাঁচাতে সে দৌড়াতে আরম্ভ করলো, আর বাঘ তার পিছু নিল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে পৌঁছালো এক গভীর খাদের কিনারায়। আর কোনো উপায় না দেখে সে দ্রুত একটা বুনো লতাকে আঁকড়ে ধরে নীচে ঝুলে পড়ল। এখন উপরে দাঁড়িয়ে বাঘ…

  • তরণী তুমি করো মোরে পার

    আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন-ব্যর্থ কবিরা পরিচালক হিসেবে ভালো হয়। কুরোসাওয়াও কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলেন শুরুতে, পরে নির্মাতা হিসেবে নাম করেছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ক্ষেত্রেও একথা খাটে। কবিতা লিখতে লিখতেই তিনি নির্মাতা হলেন। আমি কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চেয়ে নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকেই বড় করে দেখি। হুমায়ূন আহমেদও কবিতা লিখে বোনের নাম করে পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন, সেটি প্রকাশিতও হয়েছিলো। অনেক লেখকের…

  • আত্মজাগরণের নির্জন করিডোর”

    “আমি একা” এই বাক্যটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে  এক ধরনের দুঃখ, অসহায়ত্ব বা বিচ্ছিন্নতার অনুভব জেগে ওঠে। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, একা থাকা মানেই যেন অপূর্ণতা। যেন জীবনের সার্থকতা কেবল সম্পর্ক, সংযোগ, ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভেতরেই নিহিত।  মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী।বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষ বাস করে জোটবদ্ধ এক সামাজিক পরিস্থিতিতে।যার অকেকখানিই নির্ভর করে থাকে চাহিদা,নিরাপত্তা,প্রত্যাশার উপর।…

  • পাখি সম্মেলন

    একবার এক ফকির এসে এক ব্যবসায়ীর দরজায় হাত পেতে দাঁড়ালে ব্যবসায়িটি তাকে তার ভিক্ষাটুকু দিলেন বড় অনাদরে।তখন অই ফকির কেঁদে ফেললেন।ব্যবসায়ী জানতে চাইলেন কাঁদছো কেনো?ফকির উত্তর করলনে-আমার তো কিছুই নেই আমি কত অনায়াসে চলে যাবো,এই সমস্ত জাঁকজমক ছেড়ে যেতে তোমার কত কষ্ট হবে! অই একটামাত্র কথা সেই ব্যবসায়ীর জীবন আমুল পাল্টে দিলো।তিনি তার সমস্ত ধন-সম্পদ…

  • ব্রোথেল অথবা বিধ্বস্ত জীবন

    প্রেমিকার বুক থেকে মুখ তুললেই পৃথিবীটাকে একটা ব্রোথেল মনে হয়  আমার মা একটা থালায় ভাত মাখতে থাকেন বাবার ওষুধের স্ট্রীপগুলো হয়ে ওঠে ভুবুক্ষ দানব বোনের গা থেকে খসে যেতে চায় ডুরে শাড়ির আঁচল জীবন খড়ের মাঠবিধ্বস্ত সমস্ত ফসল নিয়ে আমি দিগ্বিদিক হাঁটি লম্পট আহ্লাদ আর মাসকাবারি ঠোঙারউজাড় করা দুর্ভিক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকি  ভাবি  দীর্ঘ হোক বাড়ি ফেরার পথ পকেটে হলদেটে…

  • লায়লা মজনু

    পারস্যের সপ্তম শতকের একজন কবি যার নাম কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ।যার প্রেম কাহিনী পারস্যের লোককাহিনী হয়ে ঘুরে ফিরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।পরবর্তীতে নিজামী গঞ্জভী – রচিত এক মহাকাব্য এই কিংবদন্তিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে। কী?-এইটুকু পড়ে নিশ্চয়ই চেনা যায়নি কায়েস ইবনে-আল মুলাওয়াহকে।কিন্তু জানেন কী,ইনি আমাদের খুব পরিচিত একজন! খুলে বলছি। লায়লা-মজনুর নাম জানেন না এমন কী কেউ…