ও আমার নিঃস্ব চাঁদ
মাঝে মাঝে আমার সেই রাজার গল্পটা মনে পড়ে,যার দূরারোগ্য ব্যাধির নিরাময়ের জন্য সুখী মানুষের পোশাকের খোঁজ পড়ে পুরো রাজ্যে।অবশেষে সুখী হিসেবে যাকে পাওয়া যায় তার গায়ে কোনো পোশাকই থাকেনা।
সেই গল্প পরে সুখী মানুষের উস্কখুস্ক এক মুখ এঁকে ফেলেছিলাম সেই কবে।
সুখী মানুষের কথা ভাবলে আমার এখনও সেই গল্পই মনে পড়ে।
আনা কারেনিনাতে তলস্তয় বলেছিলেন-সব সুখী পরিবারের গল্প একই রকম; কিন্তু প্রতিটি অসুখী পরিবারই তার নিজের মতো করে অসুখী।
আমি খানিক পাল্টে বলতে চাই ,সব সুখী মানুষের গল্প একই ,কিন্তু প্রতিটি দুখী মানুষ নিজের মত করেই দুখী।
দুঃখী মানুষের মুখ ভাবলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে,জন কীটস,ভ্যান গঘ,ফ্রীদা কাহলো,পারভীন শাকির,ফরাফ ফররোখজাদের মুখ।সেই মুখে আরও একটা মুখ জুড়ে যায় মীনাকুমারির।
বহুক্ষণ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলে বুকের ভেতর গলগল করে রক্ত বইতে থাকে।সুন্দর আর মোহনীয়তার আড়ালের যে জীবন তাতে যে পুরোটাই কাঁটা,ক্ষত,আঘাত।
অভাবের সংসারে দু-বোনের পরে জন্মেছিলেন মীনাকুমারি।বাবা তাকে রেখে এসেছিলেন অনাথালয়ে।পরে মায়ের কান্নাকাটিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন ঠিক।কিন্তু ফেরা বোধহয় কোনোদিন মীনাকুমারির।
চার বছর বয়সে যখন অন্য বাচ্চারা স্কুলে যেতে শেখে, তখন মীনাকুমারি স্টুডিওর দরজায় দাঁড়িয়ে কাজ খুঁজছিলেন। কাজ পেয়েও যান।সেই থেকে শুরু।
এক শিশুর শৈশব ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল ক্যামেরা, আলো আর দীর্ঘ শুটিংয়ের ভেতরে।মীনা কুমারি পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেওছিলেন,তার মনে হয়েছিলো এসব একদিন শেষ হবে।তিনি স্কুলে যাবেন,খেলবেন।কিন্তু…হয়নি।
তিনি ১৮-১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন। অনেক সময় খাবার বলতে থাকত ঠান্ডা, বাসি রুটি।
মীনাকুমারির আসল নাম মাহজাবীন বানু।সেই নামও রইলোনা তার।
তিনি বিয়ে করেছিলেন কমল আমরোহিকে। বয়সে অনেক বড় এই মানুষটিকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ আর মানসিক অত্যাচারের কারাগারে পরিণত হয়।
মীনাকুমারী মা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তর স্বামী নাকি তাকে বোঝান,মাতৃত্ব তার নায়িকার ইমেজ নষ্ট করবে। দু’বার গর্ভপাত করানো হয়। পরে শারীরিক জটিলতা এত বেড়ে যায় যে অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়।
সঞ্জয় দত্তের মা নারগিস একবার মীনা কুমারী এবং কমল আমরোহীর ঘর থেকে চিৎকার, মারধরের শব্দ শুনেছিলেন। পরে নরগিস কমলের পিএসের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন-তোমরা কি ওকে মেরে ফেলতে চাও?
কমলের কড়া নির্দেশ ছিলো যেনো মীনা কুমারীর মেকাপরুমে কোনো পুরুষ না ঢোকে।মীনা কুমারি মেনেও নিয়েছিলেন।মীনা কুমারীর কবিতার প্রতি তীব্র ভালোবাসা ছিলো।নাজ ছদ্মনামে লিখতেনও।একবার গুলজারকে মীনা কুমারি ডেকে পাঠান তার মেকাপ রুমে।এরজন্য কমলের পিএস মীনা কুমারীর গায়ে হাত পর্যন্ত তোলে।
সেই ঘটনার পর মীনা কুমারী কমল আমরোহীর বাড়ি আর ফিরে যাননি।
মীনা কুমারী মৃত্যুর আগে তার সেই লেখাগুলো গুলজারের কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন।যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়।
কমল আমরোহীর পাকিজা সিনেমার শুটিং মাঝপথে থেমে যায় তাদের বিচ্ছেদের কারণে।পরে সুনীল দত্ত ও নরগিস ছবির অসমাপ্ত অংশ দেখে কমালকে অনুরোধ করেন এই ছবি শেষ করার।
কমল মীনাকে চিঠি লেখেন। সেইসময় মীনা কুমারী লিভার সিরোসিসের মত অসুখে ভুগছেন।মীনা জবাবে লিখেন-
পাকিজা আমার হৃদয়ের খুব কাছের। আমি ছবিটা করব। পারিশ্রমিক হিসেবে শুধু একটাকা নেবো।
তখন তিনি ভীষণ অসুস্থ। দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন ছিল। তবু শুটিং চলতে থাকে। অনেক দৃশ্যে তার ফুলে ওঠা পেট লুকানোর জন্য বিশেষ পোশাক ব্যবহার করা হয়। কখনো শটের মাঝখানে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
কিন্তু তিনি কাজ থামাননি।

ছবিটি মুক্তির পর ইতিহাস হয়ে যায়।
কিন্তু তার কিছুদিন পরই মীনা কুমারী পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি বলেছিলেন-
এখন আমার আর কোনো অসমাপ্ত কাজ নেই।
তার সমাধিফলকে লেখা হয়েছিল-
She ended life with a broken fiddle,
with a broken song,
with a broken heart,
but not a single regret.
আর নরগিস তার মৃত্যুর পর লিখেছিলেন এক নির্মম অথচ মমতায় ভরা বিদায়—
মীনা, তোমার মৃত্যুতে আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাই। আমি কখনো কারো মৃত্যুতে তাকে অভিনন্দন জানাইনি,কিন্তু তোমাকে জানাই।তোমার বোন তোমার মৃতুতে তোমাকে অভিবাদন জানাচ্ছে,তোমার জন্য দোয়া করছে যেনো আর কোনোদিন তোমাকে এই পৃথিবীতে আসতে না হয়।এই পৃথিবী তোমার মতো মানুষের জন্য নয়।
একটা মানুষের জীবন যন্ত্রণা কতোটা ভারী হলে তার বন্ধুই এমন এলিজি লিখেন আমার জানা নেই।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন পরিবারের উপার্জনের যন্ত্র। প্রথমে পরিবারের জন্য, পরে স্বামীর জন্য, তারপর শেষ জীবনে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে গেছেন। চার বছর বয়স থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কখনো থামেননি।তার কপালে জোটেনি দয়া প্রেম কিংবা এতোটুকু স্নেহের পরশ।আমরা যতোটা ভাবি জীবন কোথাও কোথাও কোথাও তারচেয়েও নিষ্ঠুর।
মীন কুমারী তার কবিতায় তাই নিজেকেই ডেকে গেছেন এই বলে-ও আমার নিঃস্ব চাঁদ।